হোম > খেলা > ফুটবল বিশ্বকাপ

ডাগআউটের গ্র্যান্ডমাস্টার ‘ডন’ কার্লো!

এম. এম. কায়সার

দাবার বোর্ডে কখনো কখনো শুরুটাই ভুল হয়ে যায়।
প্রতিপক্ষ একের পর এক ঘুঁটি কেটে নেয়। দেখা গেল শুরুর ভুল চালে নৌকা হারাল। হাতিও গেল। রাজাকে ঘিরে ফেলার অপেক্ষায় প্রতিপক্ষ। গ্যালারির দর্শক তখন ধরে নেন-এই ম্যাচ শেষ। দি এন্ড!
কিন্তু সত্যিকারের গ্র্যান্ডমাস্টাররা তখনই খেলাটা শুরু করেন। তিনি আস্তিনের হাতা নতুন করে গুটাতে শুরু করেন। নতুন কায়দায় ছক সাজান। হারানো ঘুঁটির সংখ্যা গোনেন না। প্রতিপক্ষের শক্তি নয়, দুর্বলতা খোঁজেন। তারপর সাধারণ সৈন্যদের দিয়েই আস্তে আস্তে পুরো বোর্ডের রঙ বদলে দেন।
হিউস্টনের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই। আর এই গ্র্যান্ডমাস্টার আর কেউ নন-ব্রাজিল কোচ ‘ডন’ কার্লো আনচেলত্তি! পিছিয়ে পড়া ম্যাচে কীভাবে উঠে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে ফের একজোট হতে হয়, কীভাবে সমতা আনতে হয়, কীভাবে খেলোয়াড় বদলে ম্যাচের রঙ বদলে দিতে হয়, কীভাবে ম্যাচ জেতাতে হয়-এসব প্রশ্নের উত্তর কার্লো দিয়ে দিলেন ৪৫ মিনিটের একটি ফুটবল ক্লাসে।
প্রথমার্ধের খেলা দেখে মনে হচ্ছিল ব্রাজিল ছাত্র আর জাপান ম্যাচে মাস্টারি করছে। মাঠের প্রতিটি জোন ছিল যেন জাপানের দখলে। ব্রাজিল বল রাখছে; কিন্তু খেলার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই। সেলেসাওদের আক্রমণ যেন ধারহীন তরবারি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বন্দি। ব্রাজিলের পুরো মাঝমাঠ নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। একের পর এক ভুল পাসের ছড়াছড়ি। জাপান প্রথমার্ধে শুধু গোলে নয়, এগিয়ে ছিল কৌশলের সঙ্গে আরো অনেক কিছুতেই। কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর দল পাঁচ ডিফেন্ডারের দেয়াল তুলে মাঝমাঠকে সংকুচিত করে ফেলেছিল। ব্রাজিলকে বাধ্য করেছিল উইং দিয়ে বল ঘোরাতে। তবে সেই ডিফেন্স ভেদ করে ভেতরে ঢোকার কোনো রাস্তা যে ছিল না! ভিনিসিয়ুসকে দুজন মিলে আটকে রাখা। কাসেমিরোকে চাপে রাখা। বল হারিয়েই সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিং। পরিকল্পনাটা ছিল নিখুঁত।
২৯ মিনিটে সে পরিকল্পনার পুরস্কারও পেয়ে যায় তারা। দানিলোর ভুল পাস কেড়ে নিয়ে কাইশু সানোর দুর্দান্ত গোল। পুরোপুরি একক কৃতিত্বের গোল এটি। দলের কারো কাছ থেকে অ্যাসিস্টের প্রয়োজন পড়েনি তার। মাঝমাঠ থেকে বল ধরে সামনে সেই যে এগিয়ে গেলেন, পাশে থাকা ব্রাজিলের তিন মার্কারকে খসিয়ে নিখুঁত শট নিলেন ডি বক্সের বাইরে থেকে। দেখে মনে হলো স্কেল রেখে কোনাকুনি ঠিক করে সামনে যেন একটি রেখা এঁকেছেন। আর সেই দাগ ধরেই বল সোজা জালে! স্কোরলাইন জানাচ্ছে জাপান ১, ব্রাজিল ০!
গ্যালারিতে বিস্মিত ব্রাজিল। জাপানও যেন গোল করে অবাক আনন্দে আত্মহারা!
ডাগআউটে ক্যামেরা ঘুরতে দেখা গেল ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি হাত পেছনে নিয়ে কোমরের বেল্ট ধরে প্যান্ট সোজা করছেন। মুখে কোনো উদ্বেগ নেই। চোখে কোনো অস্থিরতা নেই। যেন দাবার বোর্ডে পরের পাঁচটি চাল আগেই দেখে ফেলেছেন। বিরতিতে গেল ম্যাচ এবং এ ম্যাচের আসল গল্পও শুরু হলো সেখান থেকেই।
খেলার ফল বদলে দিতে অনেকে খেলোয়াড় বদলান; কিন্তু আনচেলত্তি বদলে দেন পুরো বোর্ড। পুরো খেলা! বিরতির পরের ব্রাজিল আর প্রথমার্ধের ‘বাজে ব্রাজিল’ রইল না। এন্ড্রিককে নামালেন। ছক বদলে গেল। দুই উইঙ্গারকে টাচলাইনের গায়ে সরিয়ে দিলেন কোচ। মাঠটি হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেল। জাপানের জমাট-ঘন রক্ষণ প্রশস্ত হতে বাধ্য হলো। মাঝখানে তৈরি হলো ছোট ছোট ফাঁক। সেই ফাঁক দিয়ে ব্রাজিল যে কৌশল নিল, তার নাম ‘বল ইন দ্য বক্স’। অর্থাৎ হরিজেন্টাল অথবা ভার্টিক্যাল দুই পথ দিয়েই ব্রাজিলের লক্ষ্য তখন একটাই-জাপানের বক্সে বল ফেলা বা রাখা।
দাবায় যেমন প্রতিপক্ষের দুর্গ ভাঙতে কখনো সরাসরি আক্রমণ করা হয় না, বরং তাকে একটু একটু করে জায়গা ছাড়তে বাধ্য করা হয়Ñআনচেলত্তিও সেটাই করলেন।
একটি চাল। তারপর আরেকটি। তারপর আরো একটি। হঠাৎ করেই দেখা গেল, যে জাপান প্রথমার্ধে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছিল না, সেই জাপানই উল্টো বলের পেছনে ছুটছে। আর তাতেই ব্রাজিলের আক্রমণের জায়গা তৈরি হয়ে গেল। সেই লং বলের কৌশলে গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের ভাসানো বলে কাসেমিরোর দারুণ হেড। ৫৬ মিনিটে সমতা।
ফুটবল এমনই। এক মুহূর্তেই রঙ বদলে দেয়। যে কোচকে প্রথমার্ধে ভুলের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে সে তিনিই ম্যাচ বদলে দেওয়ার নায়ক।
কিন্তু আনচেলত্তির দাবার বোর্ডে খেলা তখনো শেষ হয়নি। জিওন সুজুকি একের পর এক সেভ করে জাপানকে বাঁচিয়ে রাখছিলেন। ম্যাচ ধীরে ধীরে অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল।
ঠিক তখনই এলো আরেকটি চাল। এবার ম্যাথুউস কুনহার জায়গায় নামলেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। অনেকেই বদলিটাকে দেখবেন একজন ফরোয়ার্ড নামানো হিসেবে। আসলে সেটা ছিল একটি নতুন ঘুঁটি দিয়ে পুরোনো ফাঁদ তৈরি করা। মার্তিনেল্লি বল পায়ে পেলেই জাপানের ডিফেন্সে চিড় ধরাতে ভেতরে ঢুকতে শুরু করলেন। ফলে বিপরীত পাশে রায়ানের জন্য খুলে গেল জায়গা। ক্লান্ত জাপানি রক্ষণ মূলত ওতেই দুলতে শুরু করল।
এবং শেষ পর্যন্ত ভেঙেই পড়ল। ইনজুরি টাইমে রায়ানের দুর্দান্ত প্রেসিং। বল কেড়ে নেওয়া, ব্রুনো গিমারায়েসের অসাধারণ ধৈর্য, তারপর এক নিখুঁত পাস। মার্তিনেল্লি এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না।
গোল। চেকমেট।
দারুণ ছকে আঁকা টিম গোল এটি। আর এ গোলেই ব্রাজিলের জয়। ব্রাজিল জিতল, তবে সহজে নয়; কিন্তু সুন্দরভাবে! সেই সৌন্দর্যই ব্রাজিল ফুটবলের প্রাণস্পন্দন।
জাপান খারাপ খেলেনি। তবে শুধু হৃদয় জিতলেই চলবে না, ম্যাচও যে জিততে হবে। সংগঠিত ফুটবল কী, শৃঙ্খলা কী, পরিকল্পনা কী-এই ম্যাচে জাপানের প্রথমার্ধের ফুটবল তারই যেন ক্লাস নিল।
কিন্তু ফুটবল ৯০ মিনিটের খেলা। কখন চাল বদলাতে হয়, কখন ঝুঁকি নিতে হয়, কখন বোর্ডের ভারসাম্য উল্টে দিতে হয়-সেটা জানেন খুব কম মানুষই। কার্লো আনচেলত্তি সেই অল্প কজনারই একজন। তিনি বলে লাথি মারেন না, গোল করেন না, দৌড়ে বেড়ান না, তর্কও তেমন করেন না। তবে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শটা আসে তার কাছ থেকেই। জাপানের বিরুদ্ধে ‘রাউন্ড অব থার্টি টু’র ম্যাচে সে প্রমাণই মিলল।
ব্রাজিল ম্যাচে সমতা এনেছে কাসেমিরোর হেডে। আর জিতেছে মার্তিনেল্লির ফিনিশিংয়ে। কিন্তু যুদ্ধটা জিতেছেন ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ডন’ কার্লো। যাকে আদর করে ভক্তরা ডাকে ‘দি সিরিয়াল উইনার’-এ নামেই!

ইকুয়েডরেকে বিদায় করে রাউন্ড অব সিক্সটিনে মেক্সিকো

জার্মানি জাপান নেদারল্যান্ডসের বিদায়ের দিনে ব্রাজিলের আনন্দ

বিশ্বকাপে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরে দাঁড়ালেন ডাচ কোচ

থ্রি লায়ন্সের আক্রমণ বনাম লিওপার্ডদের রক্ষণ

জোড়া গোলে সুইডেনকে বিদায় করে মেসির পাশে এমবাপ্পে

জার্মানির গোল ছিনতাই হয়েছে-বলছেন থিয়েরি অঁরি

জার্মানি এখন আর প্রথম সারির দল নয় : নাগলসম্যান

‘ব্রাজিল হারবে’ বলায় অর্থনীতিবিদ ক্লেমেন্তকে নেইমারের খোঁচা

ব্রাজিলিয়ানরা বাংলাদেশকে ভালোবাসে: অ্যালিসন

হালান্ডের গোলে শেষ ষোলোয় নরওয়ে, যেখানে প্রতিপক্ষ ব্রাজিল