বিশ্বকাপ শুধু ট্রফি জয়ের লড়াই নয়। এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে রাজদণ্ড হস্তান্তরের মঞ্চও বটে। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই অর্থে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। একদিকে আছেন ফুটবল ইতিহাসের মহাতারকারা, যাদের ক্যারিয়ারের সূর্যাস্ত ঘনিয়ে এসেছে। অন্যদিকে উঠে আসছে একঝাঁক তরুণ, যারা আগামী এক দশক বিশ্ব ফুটবল শাসনের স্বপ্ন দেখছে।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি ৩৯ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন। কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে তার ক্যারিয়ার পূর্ণতা পেয়েছে। অন্যদিকে ৪১ বছর বয়সি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও খেলছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখনো খুঁজছেন সেই একমাত্র ট্রফি, যা তার শোকেসে নেই। একই সারিতে আছেন ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ, ব্রাজিলের নেইমার এবং জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয়ার। বয়সের বাস্তবতা বলছে, এটাই সম্ভবত তাদের শেষ বিশ্বকাপ।
কিন্তু ফুটবল কখনো শূন্যতা পছন্দ করে না। পুরোনো নক্ষত্রের আলো ম্লান হওয়ার আগেই নতুন নক্ষত্রেরা আকাশ দখলের প্রস্তুতি নেয়।
সেই নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে আলোচিত নাম লামিনে ইয়ামাল। মাত্র কিশোর বয়সেই স্পেন ও বার্সেলোনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা এই বিস্ময়বালক ইউরো ২০২৪ মাতিয়েছেন তার অসাধারণ ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা ও বাঁ পায়ের জাদুতে। বিশ্বকাপের আগেই তিনি নিজেকে ইউরোপের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত করেছেন। অভিষেক বিশ্বকাপে খেলতে এসে ইয়ামাল যে ঘোষণা দিয়েছেন তাতেই স্পষ্ট তিনি শুধু বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সদস্য হয়েই থাকতে চান না। লক্ষ্য তার আরো অনেক উঁচুতে।
জার্মানির ভবিষ্যৎও অনেকটাই নির্ভর করছে দুই তরুণ প্রতিভা জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান উইর্টজের ওপর। মুসিয়ালার ক্ষিপ্রতা, বল নিয়ন্ত্রণ ও ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা তাকে আলাদা করেছে। অন্যদিকে উইর্টজ আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বুদ্ধিমান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারদের একজন। গোল তৈরি করা এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে তার দক্ষতা অসাধারণ।
ব্রাজিলের নতুন সেনসেশন এন্ড্রিককে ঘিরেও কৌতূহলের শেষ নেই। কৈশোরেই ইউরোপীয় ফুটবলের নজরকাড়া এই স্ট্রাইকারকে অনেকেই ব্রাজিলের পরবর্তী সুপারস্টার মনে করেন। শক্তি, গতি এবং গোল করার সহজাত ক্ষমতা তাকে বিশেষ করে তুলেছে।
মেক্সিকোর মাত্র ১৭ বছর বয়সি গিলবার্তো মোরাও আলোচনার কেন্দ্রে। এত অল্প বয়সে বিশ্বকাপ মঞ্চে জায়গা পাওয়াই তার অসাধারণ প্রতিভার প্রমাণ। বিশ্ব ফুটবল তার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে।
এই তালিকায় রয়েছেন পর্তুগালের পেদ্রো নিতোও। উইং থেকে গতিময় আক্রমণ, নিখুঁত ক্রস এবং এক-অন-এক পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার দক্ষতায় তিনি পর্তুগালের অন্যতম বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছেন। রোনালদোর প্রজন্মের শেষ অধ্যায়ের পাশাপাশি পর্তুগালের নতুন যুগের প্রতিনিধিত্ব করছেন নিতো।
তবে নতুনদের ভিড়ে সবচেয়ে বড় দাবিদার এখনো কিলিয়ান এমবাপ্পে। ইতোমধ্যে বিশ্বকাপজয়ী এই ফরাসি সুপারস্টারকে অনেকেই মেসি-রোনালদো পরবর্তী যুগের মুখ হিসেবে দেখছেন। গতি, গোল এবং বড় মঞ্চে পারফর্ম করার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের স্বপ্নটা তিনিই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন জোড়া গোল করে। কিন্তু টাইব্রেকারে সেই বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনা এমবাপ্পের স্বপ্ন ভেঙে দেয়। ভাঙা সেই স্বপ্ন নতুন করে জোড়া লাগিয়ে এবারের বিশ্বকাপে নামছেন এমবাপ্পে।
ফ্রান্সের বিশ্বকাপ দলের অধিনায়ক এবার তিনি। নতুন দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন সফলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে নিজের অভিষেকেই ট্রফি জয়ের দুর্দান্ত সাফল্য অবশ্য আছে ফরাসি এই তারকার। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ফ্রান্স। সেই বিশ্বকাপে চার গোল করেছিলেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপ ট্রফিটা আরেকবার ডাকছে তাকে!
বিশ্বকাপ ২০২৬ তাই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি দুই প্রজন্মের মুখোমুখি দাঁড়ানোর গল্প। একদিকে মেসি, রোনালদো, মদ্রিচ, নেইমার ও ন্যুয়ারদের শেষ অধ্যায়। অন্যদিকে ইয়ামাল, মুসিয়ালা, উইর্টজ, এন্ড্রিক, গিলবার্তো মোরা ও পেদ্রো নিতোদের নতুন রাজত্বের সূচনা।
এই বিশ্বকাপেই হয়তো ক্ষমতার পালাবদলের সবচেয়ে বড় দৃশ্যটি দেখতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবল।