হোম > খেলা > ফুটবল বিশ্বকাপ

উৎসব ও বিতর্ক নিয়েই আজ উদ্বোধন বিশ্বকাপের

এম. এম. কায়সার

বিশ্বকাপের বর্ণিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর হৃৎস্পন্দন যেন ধীরে ধীরে এক সুরে বাঁধা পড়ছে। সেই সুরের নাম ‘ফুটবল’ আর সেই উৎসবের নাম ‘বিশ্বকাপ’। চার বছরের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে আজ। ক্যালেন্ডারের পাতায় ১১ জুন ২০২৬—বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি শুধু একটি তারিখ নয়; একটি আবেগ, একটি স্বপ্ন, একটি বৈশ্বিক উৎসবের সূচনা। আজ রাতেই মেক্সিকোর কিংবদন্তি অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে বাজবে বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী বাঁশি। শুরু হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন, ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬।

ফুটবল নেহাৎ খেলা নয়, এটি প্রতি মুহূর্তের থরথরে আবেগ-উত্তেজনায় স্টেডিয়াম, গ্যালারি এবং বাইরের ক্রীড়াপ্রেমীদের অদ্ভুত এক বন্ধনে বেঁধে ফেলে। ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, রাজনীতি কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব— সবকিছুকে ছাপিয়ে ফুটবল মানুষকে এক জায়গায়, এক আনন্দময় সমতায় নিয়ে আসে। বিশ্বকাপের সময় পৃথিবীর প্রতিটি কোণে যেন একটাই ভাষা, একটাই অনুভূতি।

চা-দোকানের আড্ডা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, গ্রামের বাজার থেকে করপোরেট অফিস—সর্বত্রই এখন ফুটবল। কে হবে চ্যাম্পিয়ন—মেসির আর্জেন্টিনা, নাকি এমবাপ্পের ফ্রান্স? ব্রাজিল কি অবশেষে ষষ্ঠ (হেক্সা) শিরোপা জিতবে? স্পেনের গল্পটা কি এবার তাহলে লিখবেন তরুণ ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল? নাকি পুরো বিশ্বকে চমকে নতুন কোনো দল লিখবে নতুন ইতিহাস?

এবারের বিশ্বকাপ অনেক কারণেই ব্যতিক্রমী।

ফিফার ৯৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো মিলিয়ে ১৭ শহরে হবে ম্যাচগুলো। একইসঙ্গে প্রথমবারের মতো ৩২ দলের পরিবর্তে অংশ নিচ্ছে ৪৮ দেশ। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ, দলের সংখ্যার হিসাবে, ম্যাচ সংখ্যার অঙ্কেও।

নতুন ফরম্যাটে ৪৮ দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২ গ্রুপে। প্রতিটি গ্রুপে রয়েছে চারটি করে দল। গ্রুপ পর্ব শেষে ৩২ দল জায়গা করে নেবে নকআউট পর্বে। ফলে এবার ম্যাচসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ। তবে মাঠে বল গড়ানোর আগেই বিশ্বকাপ ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি। আয়োজক দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভিসা-সংক্রান্ত কঠোরতার কারণে একের পর এক ঘটনা তৈরি করেছে অস্বস্তি।

সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতান বৈধ ভিসা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি। মায়ামি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে ১১ ঘণ্টা আটকে রেখে পরে ফিরতি বিমানে উঠিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বকাপের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন আন্তর্জাতিক রেফারির সঙ্গে এমন আচরণ ফুটবল বিশ্বে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।

ইরানকে ঘিরে পরিস্থিতি আরো জটিল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরী অবস্থার কারণে ইরানের অংশগ্রহণ ও সমর্থকদের উপস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ইরান ফুটবল ফেডারেশন অভিযোগ করেছে, তাদের সমর্থকদের জন্য নির্ধারিত টিকিট বিতরণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া দলের কিছু কর্মকর্তা ও সাপোর্টিং স্টাফ ভিসা পাননি বলে ইরান অভিযোগ করেছে।

বিশ্বকাপ খেলতে ইরানের খেলোয়াড়দের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও বিশেষ বিধিনিষেধের আওতায় তাদের চলাচল সীমিত রাখা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক উৎসবের আগে এমন ঘটনা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর।

ইরাকের তারকা স্ট্রাইকার আইমেন হুসেনকেও বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তার বিষয়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তা তল্লাশি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্বকাপ মঞ্চে এমন বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীরা আশা করছেন, মাঠের লড়াই এসব আলোচনাকে ছাপিয়ে যাবে।

বিশ্বকাপে না খেললেও বাংলাদেশে শুরু হয়ে গেছে এর উন্মাদনা। ঢাকার ‘ফিফা গলি’ থেকে শুরু করে খুলনার রূপসা নদীর পাড়, বরিশালের কীর্তনখোলা, রংপুরের মাঠ কিংবা কক্সবাজারের সমুদ্রতট—সর্বত্রই এখন ফুটবলের গল্প। বাড়ির ছাদে উড়ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন ও ফ্রান্সের পতাকা। জার্সি কেনাবেচাও রয়েছে তুঙ্গে। রাজধানীর রাস্তায় এখন তাকালেই একদিকে ব্রাজিলের হলুদ জার্সির ভিড় তো অন্যদিকে আর্জেন্টিনার আকাশি-নীলের হুড়োহুড়ি, আনন্দের ছড়াছড়ি! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তর্কবিতর্ক। চায়ের কাপে চুমুকের সঙ্গে বাড়ছে আলোচনার উত্তাপও।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই এক অন্যরকম উৎসব। মধ্যরাতে খেলা দেখতে পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশীরা একত্র হয়। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও আলোচনা চলে অনেকক্ষণ। গোল, পেনাল্টি, রেফারির সিদ্ধান্ত কিংবা কৌশল—সবকিছু নিয়েই চলতে থাকে বিশ্লেষণ। মাঠের লড়াইয়েও এবার নাটকের কমতি নেই।

ফেভারিটদের তালিকায় এবারও যথারীতি সবার আগে রয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার তারা টানা দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন দেখছে। ৩৯ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল এক কীর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ট্রফি জিতলে টানা বিশ্বকাপজয়ী প্রথম অধিনায়ক হবেন মেসি। কাতার বিশ্বকাপ মেসিকে দিয়েছিল পূর্ণতা। ফুটবলপ্রেমীদের এবারের ভাবনা—এই বিশ্বকাপ মেসিকে কি দেবে?

ব্রাজিলও এসেছে বড় স্বপ্ন নিয়ে। ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপ জেতা হয়নি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ২৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা ঘুচানোর মিশনে এবার সেলেসাওদের অন্যতম ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো এবং নতুন প্রজন্মের তারকারা। চোট আছে, তবুও দলে রয়েছেন নেইমার। অনেক কিছু জিতলেও বিশ্বকাপ ট্রফিতে এখনো হাত ছোঁয়ানো হয়নি নেইমারের। ব্রাজিল তারকার সেই দুঃখ কি ফুরাবে এবারের বিশ্বকাপে?

ফ্রান্সের লক্ষ্য হারানো মুকুট পুনরুদ্ধার। কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতোমধ্যেই নিজেকে বিশ্বফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এবার তার লক্ষ্য ফ্রান্সকে আবারও বিশ্বসেরা করা।

স্পেনের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব। এ দলটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ লামিনে ইয়ামাল। কিশোর বয়সেই ইউরোপ কাঁপানো এ ফুটবলারকে অনেকেই মেসি-পরবর্তী যুগের অন্যতম বড় প্রতিভা মনে করেন। তার সঙ্গে রয়েছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের দুর্দান্ত তরুণ দল।

জার্মানির আশা জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান উইর্টজকে ঘিরে। দুজনই আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিভাবান তরুণদের মধ্যে অন্যতম। তাদের সৃজনশীলতা ও আক্রমণভাগের দক্ষতা জার্মানিকে আবারও শিরোপার লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনতে পারে।

এবারের বিশ্বকাপ আরেকটি কারণে বিশেষ। এটি হয়তো মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদ্রিচ, নেইমার ও ম্যানুয়েল ন্যুয়ারদের শেষ বিশ্বকাপ। একটি যুগের বিদায়ের মঞ্চও হতে পারে এই আসর। একইসঙ্গে ইয়ামাল, মুসিয়ালা, উইর্টজ, এন্ড্রিক কিংবা গিলবার্তো মোরাদের জন্য এটি নতুন যুগের সূচনা। বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই। এক প্রজন্ম বিদায় নেয়, আরেক প্রজন্ম এসে নতুন গল্প লেখে।

আজ রাত থেকে সে গল্পের নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।

মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম ইতিহাসের সাক্ষী হতে প্রস্তুত। ১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিল, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা—দুই কিংবদন্তির স্মৃতি বহন করা এ স্টেডিয়াম আবারও বিশ্বকাপের সূচনা দেখবে।

আগামী এক মাস পৃথিবী যেন একটি দেশে পরিণত হবে। সেই দেশের নাম ‘ফুটবল’। সেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, ভৌগোলিক সীমারেখা থাকবে; কিন্তু আবেগ থাকবে একটাই। ভাষা হবে একটাই—ফুটবল!

কে জিতবে বিশ্বকাপ? মেসি কি শেষবারের মতো জাদু দেখাবেন? এমবাপ্পে কি নতুন রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন? ব্রাজিল কি শেষ করবে দীর্ঘ অপেক্ষা? কার হাতে উঠবে এবারের বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি?

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এখানে ভবিষ্যদ্বাণী খুব কমই সত্যি হয়। প্রতি আসরেই জন্ম নেয় নতুন গল্প। নতুন নায়ক। নতুন বিস্ময়।

সে বিস্ময়ের উত্তর মিলবে ১৯ জুলাইয়ের রাতে। ওদিনই জানা যাবে কার হাতে উঠবে সোনালি ট্রফি, আর কার নাম লেখা হবে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে।

আজ থেকে ১৯ জুলাইয়ের গভীর রাত—এই পুরো ৩৯ দিন পৃথিবী ডুবে থাকবে এক উৎসবে। এমন এক উৎসব, যেখানে সীমান্তের চেয়ে বড় হয় আবেগ, আর পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ফুটবল। সেই উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠুন আপনিও!

বিশ্বকাপের মাঠে এআই

সোমালি রেফারি আর্তানের স্বদেশে বীরোচিত সংবর্ধনা

তিন সীমান্ত, এক স্বপ্ন এক বিশ্বকাপ

শেষ অধ্যায়ের নায়ক বনাম তরুণ তুর্কি

রোনালদোর ব্যর্থতার রাতেও জয়ের ছন্দে পর্তুগাল

বেলিংহাম-গর্ডনের নৈপুণ্যে আত্মবিশ্বাসী জয় ইংল্যান্ডের

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই নিরাপত্তা শঙ্কায় আর্জেন্টিনা!

ফিফা বস ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি গুলিতের

মেসির ‘ডাবল সেঞ্চুরি’র অপেক্ষায় বিশ্বমঞ্চ

গোলের রাজ্যে বায়ার্নের দাপট পিছিয়ে বার্সা-রিয়াল