একটি ফুটবল ম্যাচ বা একটি বিশ্বকাপ মিশন শেষ হতে সময় লাগে ৯০ মিনিট। কিন্তু ডিআর কঙ্গোর প্রধান কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাবারের জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি ধাক্কা গ্রাস করল মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে। একদিকে মাঠের লড়াইয়ে ৭৫ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থেকেও শেষ ১৫ মিনিটের ঝড়ে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়, অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনের মাঝেই শুনতে হলো নিজের প্রিয় বাবাকে হারানোর খবর। এক রাতেই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হলেন এই ফরাসি কোচ।
১৯৭৪ সালের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছিল আফ্রিকান দেশ ডিআর কঙ্গো। পর্তুগাল ও কলম্বিয়ার মতো পরাশক্তিদের সঙ্গে গ্রুপ ‘জে’তে পড়েও সবাইকে চমকে দিয়ে শেষ ৩২ দলের নকআউট পর্বে উঠেছিল তারা। নকআউটে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে দেসাবারের শিষ্যরা। ম্যাচের মাত্র ৭ মিনিটেই গোল করে এগিয়ে যায় কঙ্গো। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না; ৭৫ মিনিট পর্যন্ত লিড ধরে রাখলেও শেষ ১৫ মিনিটে হ্যারি কেইনের জোড়া গোলে কঙ্গোর স্বপ্নভঙ্গ হয়।
তবে দেসাবারের আসল স্বপ্নভঙ্গের গল্পটা লেখা হয়েছিল মাঠের বাইরে, ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে। দলের বিশ্বকাপ মিশন এবং ম্যাচ নিয়ে নিজের চুলচেরা বিশ্লেষণ মাত্রই শেষ করেছিলেন কোচ। ঠিক তখনই কঙ্গো ফুটবল ফেডারেশনের মিডিয়া বিভাগের কর্মকর্তা জেরি কালেমো সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে ঘোষণা করেন, ‘আপনাদের ধন্যবাদ। আমাদের কোচ তার বাবাকে হারিয়েছেন। আমাদের গভীর সমবেদনা।’
লাইভ সংবাদ সম্মেলনের মাঝে এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক খবর শুনে পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে যান দেসাবার। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হয়নি। চোখের পলকে বদলে যায় পুরো পরিবেশ। সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ছেড়ে যাওয়ার আগে অশ্রুসিক্ত চোখে শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন দেসাবার—‘ধন্যবাদ’।
অথচ এই দুঃখজনক খবরটি পাওয়ার ঠিক আগেই সংবাদ সম্মেলনে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে কোচ বলেছিলেন, ‘যতটা না হতাশ, তার চেয়ে বেশি গর্বিত। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়া সত্যিই হতাশার। তবে আমরা এই টুর্নামেন্টে ৫টি গোল করেছি। আমাদের চেয়ে অনেক ওপরের র্যাংকিংয়ের দলগুলোর বিরুদ্ধে খেলে ভালো ফল এনেছি।’
এদিকে, এমন একটি স্পর্শকাতর ও ব্যক্তিগত শোকের খবর সংবাদ সম্মেলনের মাঝে প্রকাশ্যে জানানোর প্রক্রিয়াটি নিয়ে ফুটবল বিশ্বে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লা দোফিনে’ স্থানীয় সময় ভোরে এক প্রতিবেদনে জানায়, সংবাদ সম্মেলনের মাঝপথেই কোচকে তার বাবার মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। যেভাবে খবরটি তার কাছে পৌঁছানো হয়েছে, সেই প্রক্রিয়াকে ‘মর্মান্তিক ও কাণ্ডজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
মাঠের হার হয়তো আগামী বিশ্বকাপে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন দেসাবার, কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত আর বাবার চিরতরে চলে যাওয়ার ক্ষত হয়তো তার জীবনে কখনোই শুকাবে না।