বিশ্বকাপে আলোটা সাধারণত পড়ে গোলদাতাদের ওপর। করতালি ওঠে স্ট্রাইকারের জন্য। গোলরক্ষক দুর্দান্ত সেভ করলে তিনিও নায়ক হয়ে যান। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় সত্যটি অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়—সেরা গোলরক্ষক সেই, যার সামনে প্রতিপক্ষের বড় কোনো সুযোগই তৈরি হয় না।
স্পেনের ১৯ বছর বয়সি সেন্টারব্যাক পাও কুবার্সি সেই অদৃশ্য নায়ক। পুরো টুর্নামেন্টে তার শান্ত, নিখুঁত এবং পরিণতবোধ ও বুদ্ধিমত্তার রক্ষণ বিশ্বকাপকে নতুন এক ডিফেন্ডারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। বয়সে তরুণ। কিন্তু সিদ্ধান্তে প্রবীণ। মাঠে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এই ছেলেটিই এখনো কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের শুরুতে।
স্পেন এখন পর্যন্ত পুরো বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল হজম করেছে। এই কৃতিত্বের বড় অংশই গোলরক্ষক উনাই সিমনের নামে লেখা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সিমনের সামনে বড় কোনো পরীক্ষা খুব কমই এসেছে। কারণ তার আগেই প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামিয়ে দিচ্ছেন কুবার্সি ও তার সঙ্গীরা। স্পেনের রক্ষণভাগ যেন প্রতিপক্ষের জন্য এক অদৃশ্য গোলকধাঁধা।
বিশ্বকাপে কুবার্সির পরিসংখ্যানও তার পারফরম্যান্সের মতোই উজ্জ্বল। আয়মেরিক লাপোর্তের সঙ্গে তিনি প্রতিপক্ষের অর্ধে সবচেয়ে বেশি বল পুনরুদ্ধার করা সেন্টারব্যাকদের একজন। আবার সফল ড্রিবল ও কি পাসের তালিকাতেও রয়েছেন সবার ওপরে। অর্থাৎ তিনি শুধু রক্ষণই সামলান না, আক্রমণ গড়ার প্রথম ভিত্তিপ্রস্তরও তৈরি করেন।
স্প্যানিশ দৈনিক এএস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুবার্সি জানিয়েছেন, তার স্বপ্ন এখন আর কেবল বিশ্বকাপ খেলা নয়, ট্রফিটা হাতে তোলা—‘ছোটবেলা থেকেই এমন স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু যখন আপনি এতটা কাছে চলে আসেন, তখন ট্রফি উঁচিয়ে ধরার ছবিটা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’ বার্সেলোনার এই তরুণ ডিফেন্ডার আজকের সেমিতে এমবাপ্পে, দেম্বেলে, ওলিসে ও দেজিরে দুঁয়ে এই চতুষ্টয়কে আজ কুবার্সির দেয়াল টপকাতে হবে।
ফ্রান্স ম্যাচের আগে বার্সেলোনায় তার সতীর্থ লামিন ইয়ামালকে নিয়েও দারুণ উচ্ছ্বসিত কুবার্সি। বললেন, ‘ও শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট নিয়ে ভাবে না। দলের জন্য ডিফেন্স করে, প্রেসিং করে। ওয়ান ইস্টু ওয়ান সিচুয়েশনে লামিন সত্যিই ভয়ংকর।’
নিজের আদর্শ হিসেবে কুবার্সি এখনো বেছে রেখেছেন বার্সেলোনার কিংবদন্তি অধিনায়ক কার্লেস পুয়োলকে।
আজ তার সামনে আরো বড় পরীক্ষা। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে এবং দেজিরে দুয়ে। ইউরোপের সবচেয়ে বিস্ফোরক আক্রমণভাগের বিপক্ষে স্পেনের প্রথম ভরসার নাম কুবার্সি।
এমবাপ্পেকে নিয়ে কুবার্সি জানালেন, ‘সবাই জানে সে কী করতে পারে। পুরো ম্যাচে চুপ থাকলেও এক মুহূর্তেই ম্যাচ বদলে দিতে পারে। তাই ৯০ মিনিটই সতর্ক থাকতে হবে।’
দলের দুই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার আয়মেরিক লাপোর্তে ও ইনিয়িগো মার্তিনেজের কাছ থেকেও প্রতিদিন শিখছেন বলে জানিয়েছেন কুবার্সি। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্বকাপে অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলার হিসেবে সবচেয়ে বেশি মিনিট খেলার রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
আজকের সেমিফাইনালে তাই লড়াইটা শুধু স্পেন বনাম ফ্রান্স নয়। একদিকে এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের গতির বিস্ফোরণ, অন্যদিকে কুবার্সির বরফশীতল স্থিরতা।
ফুটবলে অনেক সময় সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা হয় গোলপোস্টের সামনে নয়, তার অনেক আগেই। বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে উল্লাস করার স্বপ্ন সফল করতে হবে আজ সেই যুদ্ধে কুবার্সিকে জিততে হবে।