নারী এশিয়ান কাপে প্রথমবার খেলল বাংলাদেশ। তবে ঐতিহাসিক টুর্নামেন্টে কোনো গোল কিংবা পয়েন্ট অর্জন করতে পারেনি তারা। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই হারল লাল-সবুজের জার্সিধারীরা। চীনের কাছে ২-০, উত্তর কোরিয়ার কাছে ৫-০ ও উজবেকিস্তানের কাছে ৪-০ গোলে হেরেছে নারী দল। মোট ১১ গোল হজম করেছে তারা। এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে ফল হতাশাজনক হলেও নারী ফুটবলের যে নতুন এক অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, সেই বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ।
সর্বনিম্ন ফিফা র্যাংকিংধারী দল হিসেবে ১২ দলের টুর্নামেন্টে খেলেছে বাংলাদেশ নারী দল। শারীরিক শক্তি, সামর্থ্য ও নানা সুযোগ-সুবিধায় অনেক এগিয়ে ছিল প্রতিপক্ষ দলগুলো। তাদের বিপক্ষে লড়াকু ও সাহসী ফুটবল খেলেছে বাংলাদেশ। গোল-বন্যায় ভেসে যায়নি দল। মাঠে নিজেদের সর্বোচ্চটা নিংড়ে দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন আফঈদা, ঋতুপর্ণারা। টানা দুবারের সাফজয়ী বাংলাদেশ আঞ্চলিকতার গণ্ডি পেরিয়ে মহাদেশীয় পর্যায়ে ভালো কিছু করার আভাস দিয়েছে। কোচ বাটলারের মতে, বাংলাদেশ নারী অনেক দূর এগিয়েছে। এ পর্যন্ত তারা যা অর্জন করেছে, তাতে মেয়েদের নিয়ে গর্বিত ইংলিশ কোচ।
বাটলার সব সময় বলে আসছেন, টুর্নামেন্টে দলের জয়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং বাংলাদেশ দলের একটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করাটাই তার একমাত্র লক্ষ্য। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনামাফিক খেলে এশিয়ান কাপে অনেক কিছুই শিখেছে কোচ বাটলারের দল। যে তরুণ দলটি এশিয়া কাপ খেলল, এ দলটিকে ঘিরেই বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন।
এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ নারী দলের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে গিয়ে সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন আমার দেশকে বলেন, ‘সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এশিয়ান কাপে খেলে আমরা আমাদের অবস্থান কোথায়, সেটি উপলব্ধি করতে পেরেছি। আগে আমরা সর্বোচ্চ পর্যায়ে মায়ানমারের বিপক্ষে খেলেছিলাম। এবার এশিয়ান কাপে সবদিক থেকে এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে খেলেছি। এ টুর্নামেন্টে খেলে আমাদের ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে।’ ছোটন আরো বলেন, ‘আমাদের দলে ছিল সব তরুণ খেলোয়াড়। এমন বড় টুর্নামেন্টে তরুণদের পরীক্ষা দেওয়াটা চ্যালেঞ্জিং। বড় দলের বিপক্ষে তাদের জন্য খেলাটা বেশি চাপের হয়েছে। যে কারণে ভুল-ভ্রান্তিও হয়েছে। তবে সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলেছে মেয়েরা। বয়স কম হওয়ায় তাদের লোড বেশি হয়েছে। আমি মনে করি, শারীরিক ও মানসিকভাবে চাপে ছিল তারা। তবে ইতিবাচক ফুটবল খেলেছে দল। মাঠে পুরো ৯০ মিনিট লড়াই করেছে। তবে তাদের আরো অনেক উন্নতি করতে হবে। কেননা উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি জেতার কথা ভাবছিলেন অনেকে। কিন্তু আসল বাস্তবতা দেখিয়ে দিল উজবেকিস্তান ম্যাচটি।’
উজবেকিস্তানের ম্যাচটি মাঠে বসে উপভোগ করেছেন বাফুফে সহ-সভাপতি ফাহাদ করিম। গতকাল অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরার পথে সিঙ্গাপুর থেকে মুঠোফোনে ফাহাদ করিম আমার দেশকে বলেন, ‘এই টুর্নামেন্টে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো অভিজ্ঞতা অর্জন। এশিয়ান কাপের মতো বড় পর্যায়ে খেলা, সেরাটা দিয়েই খেলেছে মেয়েরা। আমাদের কোনো হতাশা নেই। তাদের পারফরম্যান্সে আমরা সন্তুষ্ট।’ বাংলাদেশ দলের তারকা খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমা বলেছেন, ‘এত বড় মঞ্চে খেলা আমাদের স্বপ্ন ছিল। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে আমাদের আরো কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আপাতত আমাদের এখানেই থামতে হচ্ছে। আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন এবং আমাদের সঙ্গেই থাকুন।’ স্ট্রাইকার তহুরা খাতুন বলেন, ‘প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপে খেলার সুযোগ পেয়ে আমরা সত্যিই গর্বিত। দেশের জার্সি গায়ে দিয়ে আমরা সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, দেশের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়েছি। আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না।’ মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা বলেছেন, ‘হয়তো এবার আমরা জিততে পারিনি, আমরা খালি হাতে ফিরছি। তবে একদিন আমরা মাথা উঁচু করে ফিরব এবং জয়ী হব।’
এদিকে, এশিয়ান কাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পরপরই বাংলাদেশের দায়িত্ব ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইংলিশ কোচ পিটার বাটলার। বাফুফের সঙ্গে তার আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত চুক্তি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে দলের সঙ্গে ঢাকায় ফিরলেও ছুটি কাটাতে দেশে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বাটলার। এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ কোনো গোল করতে না পারলেও এই কোচ যেভাবে দলকে কোচিং করিয়েছেন, তাতে খুশি বাফুফে। ফাহাদ করিম বলেন, ‘বাটলার আমাদেরকে দুটি এশিয়ান কাপে (সিনিয়র ও অনূর্ধ্ব-২০) নিয়ে গেছেন। এটা এত সহজ নয়। তার কাজে আমরা খুবই খুশি। শুনেছি, তিনি থাকতে চাচ্ছেন না, এরকম কিছু একটা। তবে এ ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি।’ কোচ বাটলারকে রেখে দেওয়ার পক্ষে বাফুফে। তবে শেষ পর্যন্ত এই কোচ থাকবেন কি না- সেটি সময়ই বলে দেবে।