ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। আর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ব্যতিক্রমী আসর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে, তিনটি দেশে এবং ১০৪টি ম্যাচের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হবে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। ফলে বিশ্বকাপের পরিধি যেমন বাড়ছে, তেমনি বদলে যাচ্ছে টুর্নামেন্টের কাঠামোও। বিশ্বকাপ শুরুর আগে পাঠকদের মনে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর তুলে ধরা হলো বিস্তারিতভাবে-
কবে শুরু হবে বিশ্বকাপ?
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হবে ১১ জুন এবং শেষ হবে ১৯ জুলাই। অর্থাৎ টুর্নামেন্টটি চলবে টানা ৩৯ দিন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে আর কোনো আসর অনুষ্ঠিত হয়নি। দল এবং ম্যাচসংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই টুর্নামেন্টের দৈর্ঘ্যও বেড়েছে। উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে। স্বাগতিক মেক্সিকো সেই ম্যাচে মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকার। আর ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই মহাযজ্ঞ।
নতুন ফরম্যাটে কী পরিবর্তন এসেছে?
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যায়। ১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্বকাপ ৩২ দলের ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো অংশ নেবে ৪৮টি দল। এই দলগুলোকে ভাগ করা হবে চারটি করে দল নিয়ে ১২টি গ্রুপে। প্রতিটি দল গ্রুপপর্বে তিনটি করে ম্যাচ খেলবে। এরপর প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি পরের রাউন্ডে যাবে। পাশাপাশি ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা আটটি তৃতীয় স্থানাধিকারী দলও নকআউট পর্বে জায়গা পাবে। নকআউট পর্বে মোট ৩২টি দল খেলবে। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৩২ দলের নকআউট রাউন্ড দেখা যাবে।
টুর্নামেন্টের সূচি কেমন?
গ্রুপপর্ব চলবে ১১ জুন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে ৭২টি ম্যাচ। এরপর ২৮ জুন থেকে শুরু হবে ৩২ দলের নকআউট পর্ব। ৪ থেকে ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে শেষ ষোলো। কোয়ার্টার ফাইনাল হবে ৯ থেকে ১১ জুলাই। ১৪ ও ১৫ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে দুটি সেমিফাইনাল। ১৮ জুলাই হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ এবং ১৯ জুলাই হবে মহারণ—ফাইনাল।
কোথায় অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ?
বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ একসঙ্গে টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে। আয়োজক দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির আটালান্টা, বোস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি, ফিলাডেলফিয়া, সিয়াটল, সান ফ্রান্সিসকো-সান্তা ক্লারা এবং নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি অঞ্চলের স্টেডিয়ামগুলো বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করবে।
মেক্সিকোতে খেলা হবে মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা এবং মন্টেরেতে। অন্যদিকে কানাডার দুটি শহর—টরন্টো ও ভ্যানকুভার—বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করবে। বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে আজটেকা স্টেডিয়াম। কারণ এই স্টেডিয়ামই প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ আয়োজনের ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে খেলা দেখার সময়সূচি
তিনটি দেশ এবং চারটি ভিন্ন সময় অঞ্চলে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে সময়সূচি হবে বেশ বৈচিত্র্যময়। একেকটি ম্যাচের শুরু হওয়ার সময়ের মধ্যে পার্থক্য থাকবে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত। বাংলাদেশে বেশির ভাগ খেলাগুলো দেখা যাবে রাত ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টায়, আবার কোনো কোনো ম্যাচ রাত ১০টা, রাত ১টায়ও শুরু হবে।
শিরোপার প্রধান দাবিদার কারা?
বিশ্বকাপের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে স্পেন। ইংল্যান্ডও রয়েছে শিরোপার দৌড়ে। ফ্রান্সকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আবারও অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে আসছে। বাছাইপর্বে কিছুটা অনিয়মিত পারফরম্যান্স করলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলকে কখনোই হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ঐতিহ্য ও প্রতিভার গভীরতা সব সময়ই তাদের অন্যতম দাবিদার করে রাখে।
কোন দলগুলো চমক দেখাতে পারে?
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই কিছু দল প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করে। ২০২৬ সালে সেই তালিকায় থাকতে পারে নরওয়ে, মরক্কো, জাপান, কলম্বিয়া এবং মিসর।
কারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলবে?
২০২৬ বিশ্বকাপ নতুন কয়েকটি দেশের জন্য বিশেষ স্মরণীয় হতে যাচ্ছে। কুরাসাও, কেপ ভার্দে, উজবেকিস্তান এবং জর্ডান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলবে। দেশ হিসেবে নতুন নাম গ্রহনের পর এবারই প্রথম কঙ্গো রিপাবলিক বিশ্বকাপে খেলছে। তবে এই দেশটির পূর্বনাম ছিল জায়ারে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে জায়ারে অংশ নিয়েছিল।
কেন ২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসে আলাদা?
এই বিশ্বকাপকে বিশেষ করে তুলেছে একাধিক কারণ। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে। প্রথমবারের মতো ম্যাচ সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে ১০৪-এ পৌঁছেছে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ একসঙ্গে আয়োজন করছে টুর্নামেন্টটি। আবার প্রথমবারের মতো ৩২ দলের নকআউট পর্ব দেখা যাবে। সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু আরেকটি বিশ্বকাপ নয়; এটি ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। উত্তর আমেরিকার মাটিতে আগামী জুনে শুরু হতে যাওয়া এই আসরকে ঘিরে তাই ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে অপেক্ষার প্রহর।