ফুটবল কেবল গোল, ট্রফি আর পরিসংখ্যানের খেলা নয়—এটি স্মৃতি, সম্পর্ক আর আবেগেরও গল্প। সেই গল্পই যেন নতুন করে শুনিয়েছেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা রিও ফার্ডিনান্ডের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ আলাপে তিনি ফিরে গেছেন সময়ের পেছনে—যেখানে আছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা, আছেন লিওনেল মেসি, আর আছে এক প্রজন্মের ফুটবল আত্মার গল্প।
ফার্ডিনান্ডের পডকাস্টে ম্যারাডোনার নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই যেন কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে বাতিস্তুতার। জাতীয় দলে একসঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতি তার চোখে এখনো জ্বলজ্বল করে। তিনি বলেন, ম্যারাডোনা ছিলেন জটিল, কখনো রহস্যময়—তবু ভেতরে ছিলেন অসাধারণ এক মানুষ। তারপরই আসে সেই বেদনামাখা স্বীকারোক্তি। যে কথাগুলো শুধু একজন সতীর্থের নয়—এ যেন এক বন্ধুর, এক ভক্তের, এক অনুতপ্ত মানুষের কণ্ঠ, ‘এটা দুঃখজনক, কারণ তিনি একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন এবং একাই মারা গেছেন। তার পাশে কেউ ছিল না। তিনি কুকুরের মতো মারা গেছেন। আমি নিজেকেও দোষ দিই, কারণ আমি তার সমর্থকদের একজন ছিলাম। কাউকে ভালোবাসলে, তার প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা উচিত।’
বাতিস্তুতা জানান, সুপার হিরোদেরও ব্যথা থাকে। ফুটবল বিশ্ব যাদের ‘ঈশ্বর’ বানিয়ে ফেলে, বাতিস্তুতা তাদের মানুষ হিসেবেই দেখেন। তার চোখে, ম্যারাডোনা শুধু একজন কিংবদন্তি নন—তিনি একজন মানুষ, যিনি ভালোবাসতেন, ভাঙতেন, আবার লড়তেন। বাতিস্তুতা বলেন, বাইরে থেকে তারকারা অপ্রাপ্য মনে হয়, যেন তাদের জীবনে কষ্ট নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—তাদেরও দুঃখ আছে, একাকিত্ব আছে, লড়াই আছে। আর সেই জায়গা থেকেই তার প্রার্থনা, ম্যারাডোনার মতো পরিণতি যেন না হয় তার উত্তরসূরি লিওনেল মেসির।
পডকাস্টে ফার্ডিনান্ড মেসিকে নিয়েও প্রশ্ন করেছিলেন। বাতিস্তুতা দুজনকে এক পাল্লায় মাপলেন না। তার চোখে মেসি ও ম্যারাডোনা দুই নদী, দুই স্রোত। দুজনকে তিনি এক চোখে দেখলেও বাস্তবতার আয়নায় ভিন্ন। বাতিস্তুতা এই তুলনাকে সরল রেখায় আনতে চান না। তার ভাষায়, ‘মেসি যেন শান্ত নদী—ধারাবাহিক, নিখুঁত, পরিসংখ্যানের জাদুকর আর ম্যারাডোনা ঝড়ের মতো, অপ্রত্যাশিত, আবেগে ভরা এক বিস্ফোরণ।’ তিনি মনে করেন, দক্ষতায় দুজনই অনন্য, কিন্তু খেলার ওপর সর্বাত্মক প্রভাব, সেই অদৃশ্য ক্যারিশমা—সেখানে ম্যারাডোনা আজও একক ও অদ্বিতীয়।
এরপর তাকে নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাতিস্তুতা নিজেকে গোলের কবি হিসেবেই আখ্যায়িত করলেন। নিজেকে তিনি বলেন ‘প্রাকৃতিক স্ট্রাইকার’। যেন জন্মই হয়েছিল গোল করার জন্য। ইতালির ফিওরেন্টিনার জার্সিতে তার গোলগুলো আজও কিংবদন্তির অংশ। শক্তি, নিখুঁততা আর আবেগ—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক ভিন্ন ধরনের ফরোয়ার্ড। আর আলাপের শেষপ্রান্তে এসে বাতিস্তুতা যেন নিজের এক ছোট্ট স্বপ্নের মাঠ তৈরি করেন। সেখানে তিনি পাশে চান ফার্নান্দো রেডন্ডোর শৈল্পিকতা, কাফুর দৌড়, ফ্রানচেস্কো তোত্তির সৃজনশীলতা, ক্লদিও কানিজিয়ার গতি—আর মাঝখানে থাকবেন তার প্রিয় ম্যারাডোনা। যেটা তার কাছে ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর ছবি—বন্ধুত্ব, প্রতিভা আর স্মৃতির এক অমলিন ফ্রেম।