ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির পথগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কর্তৃত্বের বিষয়টি হয়তো মেনে নিতে শুরু করছে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো।
গত এক সপ্তাহে ইরান ও তার মিত্ররা সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কৌশল ব্যবহার করে ওই অঞ্চলে সামান্য যেটুকু স্থিতিশীলতা ছিল, তাও ওলটপালট করে দিয়েছে, যার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হচ্ছে ইয়েমেন। ইয়েমেনের ঘটনা আমেরিকার সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতিকে মূলত ইরানের অনুকূলে নিয়ে যাচ্ছে।
অবশ্য এই পরিবর্তন হয়তো চূড়ান্ত কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না। কারণ, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখনো তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। আমেরিকার নৌ অবরোধের কারণে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো অচল হয়ে পড়েছে এবং একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান ও তার মিত্রদের চালানো ধারাবাহিক হামলার ফলে সংঘাতের পরিধি আরো বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে তেহরান হয়তো এই মুহূর্তে বাড়তি সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে।
শুক্রবার ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের একটি দ্বীপ দখলে নেয়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হবে, যা এক হিসাবে ইরানকে লাভবান করবে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, ইয়েমেনে হুথিদের সাফল্য পরিস্থিতিকে আবারও ইরানের অনুকূলে নিয়ে গেছে। ইরান পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বা সংঘাতের দিকে না গিয়েই বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে।
যদিও হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও রসদ দিয়ে সহায়তা করে থাকে ইরান। তার পরও বিশ্লেষকেরা বলছেন, শিয়া মতাবলম্বী এই গোষ্ঠী ইয়েমেনে ইরানের স্বার্থ রক্ষায় সরাসরি জড়িত নয়, আবার তেহরানের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনও নয়।
লোহিত সাগরের একটি দ্বীপ দখলে নেওয়ার পর শুক্রবার তেলের দাম সাময়িকভাবে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১১০ ডলারে বেড়েছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এটিও ইরানকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। কারণ, জ্বালানির উচ্চমূল্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষ করে আগামী নভেম্বরে তার দল মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব মূলত লোহিত সাগরের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কারণ, যুদ্ধের শুরুর দিকেই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু জুলাই মাসে হুথিরা সৌদি জাহাজের ওপর অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে গুলিবর্ষণ ও সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে।
গত মাসে সৌদি আরব থেকে তেল রপ্তানি নাটকীয়ভাবে কমে গেছে, যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার ইরাকের ভূখণ্ড থেকে চালানো এক ড্রোন হামলার পর লোহিত সাগরের বন্দরগুলোতে তেল পরিবহনকারী একটি পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। হামলার পেছনে কারা ছিল, তা স্পষ্ট না হলেও ইরাকে অবস্থিত ইরান সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে সৌদি আরব। এছাড়া শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ হামলার জন্য ‘সম্ভবত’ ইরানই দায়ী।
ফেব্রুয়ারিতে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের মিত্রদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইরান।