নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার প্রাক্কালে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সিচুয়েশন রুমে উপস্থিত ছিলেন তাই নয়, তিনিই আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। নেতানিয়াহু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটাতে পারে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই, সেই আশাবাদী আশ্বাসগুলো ভুল প্রমাণিত হয়, পাল্টে যায় পরিস্থিতি। দুজন ইসরাইলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলকে এতটাই কোণঠাসা করে ফেলেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে এর নেতাদের প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।
ওই দুজন কর্মকর্তা বলেন, তাদের সবচেয়ে কাছের মিত্রের কাছ থেকে তথ্যবঞ্চিত হয়ে পড়ে ইসরাইল। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনা সম্পর্কে তথ্যের জন্য তাদের এখন এই অঞ্চলের নেতা ও কূটনীতিকদের সঙ্গে সংযোগ এবং ইরানে ইসরাইলের গুপ্তচরদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ককপিট থেকে ইকোনমি ক্লাসে নির্বাসিত হওয়ার এই ঘটনাটি ইসরাইলের জন্য এবং বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্য, সম্ভাব্য গুরুতর পরিণতি বয়ে আনছে। তিনি এই বছর পুনর্নির্বাচনে এক কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলি ভোটারদের কাছে নিজেকে ট্রাম্প-বিশেষজ্ঞ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি প্রেসিডেন্টের সমর্থন আদায় ও ধরে রাখতে বিশেষভাবে সক্ষম। যুদ্ধের শুরুতে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমকক্ষ হিসেবে তুলে ধরেন। ইসরাইলিদের আশ্বস্ত করেন যে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন কথা বলেন, পরামর্শ করেন এবং একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলকে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এমন এক লক্ষ্য অর্জনের বিশাল স্বপ্ন নিয়ে, যা তিনি কয়েক দশক ধরে পুরণ করার চেষ্টা করে আসছেন: ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা চিরতরে বন্ধ করা। যুদ্ধের শুরুর দিকেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নিহত হন। তখন মনে হচ্ছিল যেন আরো একটি বিশাল স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে: শাসনব্যবস্থার পতন।
কিন্তু ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের অনেকেই শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ধারণাটিকে বরাবরই অযৌক্তিক বলে মনে করতেন। খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অগ্রাধিকারগুলো ভিন্ন পথে চলতে শুরু করে, বিশেষ করে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর। হরমুজ বন্ধ হওয়ায় তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায় এবং যুদ্ধবিরতিতে রাজি হতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। পরাজিত হওয়া তো দূরের কথা, ইসলামী প্রজাতন্ত্র কেবল যুদ্ধে টিকে থেকেই এমন আচরণ করেছে যেন তারা যুদ্ধে জয়ী হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরাইল দেখছে যে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যগুলো তার নাগালের বাইরেই থেকে গেছে।
যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহু তিনটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন: শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং এর ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নির্মূল করা। এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।
ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কবর দেওয়ার পরিবর্তে, সাম্প্রতিক একটি মার্কিন প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর ২০ বছরের জন্য স্থগিতাদেশ বা মোরাটোরিয়ামের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন তেলআবিবকে আলোচনা থেকে বাদ দেওয়ায়, ইসরাইলি কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আলোচনার বাইরেই থেকে যেতে পারে।
এটি ইসরাইলি জনগণের জন্যও হবে হতাশাজনক ধাক্কা, যাদের জীবনযাত্রা মার্চ ও এপ্রিল মাসে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে ইসরাইলের আরো কিছু উদ্বেগ রয়েছে, যার মধ্যে তেহরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াও অন্তর্ভুক্ত। এমনটা করা হলে তা একটি অর্থনৈতিক লাইফলাইনের সমতুল্য হতে পারে, যা ইরানকে শত শত কোটি ডলারের জোগান দেবে। এই অর্থ তারা পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত হতে এবং হিজবুল্লাহর মতো তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলোকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারবে।
যদিও চূড়ান্ত চুক্তিটি কেমন হতে পারে তা এখনো নিশ্চিত নয় এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে যেকোনো চুক্তিও স্থগিত হয়ে যেতে পারে। তারপরও স্পষ্ট প্রতিয়মান হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অংশীদারিত্বের জন্য ইসরাইলকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। যে দেশটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ‘নিজেদের রক্ষা নিজেরাই করতে পারি’ এই ধারণায় গর্ববোধ করত এবং যার নেতারা তাদের একগুঁয়ে অনমনীয় মনোভাব দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বিরক্ত করেছেন, সেই দেশটিই এখন ট্রাম্পের দাবি মেনে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও ইচ্ছার কথা প্রায়ই গোপন রাখছে না।
২৩ এপ্রিল, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার এবং ইরানকে বোমা মেরে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ বলেছিলেন, ‘আমরা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবুজ সংকেতের জন্য অপেক্ষা করছি।’
যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে এই দুই দেশ সাফল্য সম্পর্কে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে তারা ইরানের জনগণকে শাসনব্যবস্থা উৎখাত করে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল।
সেই সময়ে, তারা অভূতপূর্ব মাত্রার সহযোগিতা অর্জনের কথা গর্বের সাথে বলত; তাদের সামরিক বাহিনীগুলো একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছৃক কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ধেয়ে আসা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের জবাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমন মুহূর্তের সিদ্ধান্তগুলোও যৌথভাবে নেওয়া হচ্ছিল।
দুই সপ্তাহের মধ্যেই এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এই যুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিজয় আসবে না। হোয়াইট হাউস এবং কিছু ইসরাইলি নেতা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আশা ত্যাগ করলেন এবং ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার দিকে মনোযোগ দিলেন। তার চিন্তাভাবনার সাথে পরিচিত মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে যুদ্ধের মিত্র হিসেবে দেখলেও, ইরানিদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে তাকে ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে দেখতেন না। প্রকৃতপক্ষে, তিনি মনে করতেন যে সংঘাত নিরসনের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুকে সংযত রাখা প্রয়োজন।
ইসরাইল শিগগিরই নিজেকে সমান অংশীদার থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন উপ-ঠিকাদারের মতো অবস্থানে নেমে আসতে দেখল।
ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ইরাক থেকে কুর্দি যোদ্ধাদের ইরানে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই ধারণাকে সমর্থন করার দুই দিন পরেই ৭ মার্চ, তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। এয়ার ফোর্স ওয়ানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চাই না কুর্দিরা ভেতরে যাক। আমি কুর্দিদের আহত বা নিহত হতে দেখতে চাই না।’
সেই একই সপ্তাহান্তে, ইসরাইল তেহরান এবং নিকটবর্তী শহর কারাজে তেল স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালায়। দুজন ইসরাইলি কর্মকর্তার মতে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই এই অভিযানের অনুমোদন দিয়েছিল, তবে তারা একটি ছোট কিন্তু প্রতীকী হামলার প্রত্যাশা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, স্বল্পমাত্রায় হামলা চালিয়ে ইরানকে সংকেত দিতে হবে যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি শিল্পকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
জ্বলন্ত জ্বালানি থেকে সৃষ্ট বিপজ্জনক রাসায়নিক বহনকারী কালো ধোঁয়ার বিশাল মেঘ বেশ কয়েকদিন ধরে তেহরানের ওপর ভেসে বেড়ায়। উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় ইরান হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়ে দেয় যে তারা এ ধরনের হামলার বিষয়ে একমত নয় এবং ইসরাইলকে তারা এই ধরনের অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করতে বলেছে।
এটাই একমাত্র ঘটনা ছিল না যেখানে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে পরিকল্পনা অনুমোদন করার পর, সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের বিপদে ফেলে দিয়েছে।
পরবর্তীতে যখন ইসরাইল দক্ষিণ ইরানের পারস্য উপসাগর বরাবর সাউথ পার্স প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র এবং তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, তখনও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।
ট্রাম্প এই ধরনের বোমা হামলা বন্ধ করার নির্দেশ দেন, কিন্তু তার আগে তিনি মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো একাধিক বিবৃতি দেন। তিনি প্রথমে বলেন সাউথ পার্স হামলা সম্পর্কে আগে থেকে জানতেন না। এরপর তিনি ভয়াবহ হামলার জন্য ইসরাইলের সমালোচনা করেন এবং অবশেষে ইঙ্গিত দেন যে, হামলার বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা হয়েছিল সত্য, তবে সেসময় তিনি আক্রমণ না চালানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
সেই রাতে নেতানিয়াহু স্বীকার করেন, ইসরাইল একাই এই হামলা চালিয়েছে। আসালুয়েহ এবং সাউথ পার্সের হামলার বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রথম সত্য, ইসরাইল একাই কাজ করেছে। দ্বিতীয় সত্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের ভবিষ্যতের হামলা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন এবং আমরা তা করছি।’
এমনকি ট্রাম্প ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির কয়েক দিনের মধ্যেই লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের অভিযান বন্ধ করার জন্য চাপ দেন।
এই কোণঠাসা হয়ে পড়াটা কোনো কোনো ইসরাইলি কর্মকর্তার জন্য মেনে নেওয়া বিশেষভাবে কঠিন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন, দেশটি স্বেচ্ছায় যুদ্ধের কিছু বিতর্কিত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা, যা যুক্তরাষ্ট্র নিজে কখনো প্রকাশ্যে করেনি।
শুরুতে নেতানিয়াহু তার জনগণকে বলেছিলেন যে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র এবং তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের অস্তিত্বের হুমকি দূর করাই একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু ১২ মার্চের মধ্যে নেতানিয়াহু একটি নতুন ধারণা তুলে ধরেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বকে মহিমান্বিত করে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে জোট ইসরাইলকে আরো শক্তিশালী করেছে।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস
আরএ