স্থল ও আকাশপথে একযোগ সৌদি আরবে হামলা চালাচ্ছে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। এসব হামলার মুখে ক্রমেই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ছে সৌদি আরব । সৌদি আরব এখন একসঙ্গে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি।
ইয়েমেনে তাদের মিত্ররা হুথিদের অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়ার চেষ্টা করছে, একই সময়ে সৌদি আরবের অভ্যন্তরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে সৌদি বিমান প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধকও সীমিত হয়ে আসছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সৌদি আরব যে মার্কিন নিরাপত্তাবলয়ের ওপর নির্ভর করে আসছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্র এখন এ বিষয়ে অনেকটা নিষ্ক্রিয় বা উদাসীন।
সপ্তাহান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ‘হুথিরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং তারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না।’ বুধবার রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, ওমানের মধ্যস্থতায় হুথি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব তার প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতোই সৌদি আরবের নতুন মিত্ররাও হুথিদের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি।
মক্কা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের নাম থাকলেও বাস্তবে তাদের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
চ্যাথাম হাউসের উপসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নীল কুইলিয়াম মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘সৌদি আরব এখন চরম সংকটে এবং তারা অনেকটাই একা। যুক্তরাষ্ট্র পাশে নেই, মক্কা চুক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোও এগিয়ে আসেনি। তাদের হাতে এখন খুব কমই বিকল্প বা কৌশল অবশিষ্ট আছে।’
ইরাকভিত্তিক ইরান-ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়ার ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হুথিরা সৌদি শহরগুলোতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। ফলে তেল রপ্তানি ও দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীগুলোর অবস্থাও দুর্বল। হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তাইজ ও মারিবের দিকে এগোচ্ছে। একদিকে ইয়েমেনে স্থলসেনা পাঠাতে অনিচ্ছুক সৌদি আরব, অন্যদিকে কার্যকর স্থানীয় মিত্রের অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি-সমর্থিত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সও হুথিদের অগ্রযাত্রার মুখে ভেঙে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) তুলনামূলকভাবে কার্যকর যোদ্ধাশক্তি হলেও তাদের সমর্থক সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের মতপার্থক্য রয়েছে।
রিয়াদ আবারও দীর্ঘস্থায়ী ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সৌদি আরব সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। এখন সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে সীমিত বিমান হামলা, হুথিদের ওপর সামরিক চাপ বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা রাখার কথা বলা হচ্ছে।
হুথিদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দর অবাধে পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। তাদের সঙ্গে সমঝোতা করলে সৌদি আরবের জন্য তা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে; আবার সামরিক সংঘাত বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মিত্ররা কতটা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত তার ওপর। সম্ভাব্য পথগুলোর মধ্যে সীমিত বিমান অভিযান এবং বাব আল-মান্দেবকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার আওতায় আনার উদ্যোগও রয়েছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
আরএ