সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপের তেল সরবরাহ নতুন করে চাপে পড়েছে। দীর্ঘ সময় পাইপলাইনটি বন্ধ থাকলে ইউরোপের শোধনাগারগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করতে হবে। এতে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। বাড়তে পারে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির দামও।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় ১০ সেপ্টেম্বর পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দেয়। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পাইপলাইনে ড্রোন হামলা হয়। হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত হুথি ও ইরাকের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করা হয়েছে।
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন ১৯৮১ সালে চালু হয়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পৌঁছাতে এটি ব্যবহার করা হয়। ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল সরবরাহের সুযোগ থাকে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরাইল সংঘাত শুরুর পর প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় সৌদি পাইপলাইনটি ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল। বন্ধ হওয়ার আগে পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছিল, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ।
পাইপলাইন বন্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে ইউরোপে পড়তে শুরু করেছে। সৌদি আরব ইয়ানবু বন্দর থেকে ইউরোপে পাঠানোর কয়েকটি তেলের চালান বাতিল বা পিছিয়ে দিয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর আর্গাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপের অন্তত তিনটি শোধনাগারের সেপ্টেম্বরের শেষের চালান বাতিল বা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর কিছু নভেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে।
বিকল্প জোগাড়ে নেমেছে ইউরোপের শোধনাগারগুলো। পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি অরলেন অক্টোবর পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে নরওয়ে, যুক্তরাজ্য, আলজেরিয়া, কাজাখস্তান, আজারবাইজান ও আমেরিকা থেকে অতিরিক্ত ১৬টি তেলের চালান কিনেছে।
১৬ সেপ্টেম্বর অরলেন জানায়, এসব সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে এবং চাহিদা মেটাতে তা যথেষ্ট।
তবে সৌদি তেলের বিকল্প জোগাড় করলেই সমস্যা মিটবে না। বিভিন্ন শোধনাগার নির্দিষ্ট মানের অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের জন্য তৈরি। ইউরোপের অনেক শোধনাগার সৌদি আরবের মাঝারি ও তুলনামূলক ভারী, সালফারযুক্ত তেলের ওপর নির্ভরশীল। অন্য ধরনের তেল ব্যবহার করতে হলে একাধিক উৎসের তেল মিশিয়ে নিতে হতে পারে। এতে খরচ বাড়বে এবং কিছু শোধনাগারে কার্যক্রমেও পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহ বলেন, লোহিত সাগর দিয়ে আরবের তেল নেওয়া ইউরোপীয় শোধনাগারগুলোর বিকল্প প্রয়োজন। কারণ সব ধরনের অপরিশোধিত তেল একে অপরের সরাসরি বিকল্প নয়।
সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়াতে পারে। পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিশ্লেষকেরা প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ার কথা বলছেন। ব্রেন্টের দাম সম্প্রতি ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারের ওপরে উঠেছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে ডিজেলের বাড়তি দামের চাপ কমানোর চেষ্টা করছে।
সংকট কতটা দীর্ঘ হবে, তা নির্ভর করছে সৌদি আরব কত দ্রুত পাইপলাইন মেরামত করতে পারে এবং নতুন করে হামলা হয় কি না, তার ওপর। কেপলারের প্রধান তেল বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহী বলেন, পাইপলাইনের ছোটখাটো ক্ষতি মেরামত করা হলেও পাম্পিং স্টেশনসহ পুরো ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
কেপলারের ১৪ সেপ্টেম্বরের হিসাবে, ক্ষতিগ্রস্ত পাম্পিং স্টেশন এড়িয়ে একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে এবং মজুতের ওপর নির্ভর করছে। ইয়ানবু বন্দর থেকেও তেল রপ্তানি আংশিকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, ইয়ানবু টার্মিনালে অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৯ হাজার ব্যারেল। পশ্চিম উপকূলের শোধনাগারগুলোতে মজুত প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ ব্যারেল। নতুন করে পাইপলাইনে তেল না এলে বর্তমান হারে এসব মজুত দিয়ে ইয়ানবু বন্দরের চালান প্রায় তিন দিন এবং শোধনাগারগুলো প্রায় নয় দিন চালানো সম্ভব।
তবে ১৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পাইপলাইনের অর্ধেক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। এতে সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোয় নতুন হামলার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
পাইপলাইন দ্রুত পুরোপুরি সচল না হলে ইউরোপে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম আরো বাড়তে পারে। তখন সৌদি আরবের একটি আঞ্চলিক সরবরাহ সংকট ইউরোপের শোধনাগার, শিল্প ও ভোক্তাদের জন্য বড় ধরনের জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির চাপ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: ইউরো নিউজ
এএম