চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং আগামী সোমবার দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন। দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর তার এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত জোট গঠনের মাধ্যমে নিজের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত করে বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন। এর আগে যখন শি জিনপিং উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন, তখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় বেশ চাপে ছিলেন কিম।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দিনের এই শীর্ষ সম্মেলনে শি জিনপিং পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দুই মিত্র দেশের একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট বা অবস্থান প্রদর্শন করতে চান। তবে একই সঙ্গে বেইজিং তার প্রতিবেশী দেশের ওপর প্রভাব বজায় রাখতে আগ্রহী, যে দেশ সম্প্রতি রাশিয়ার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। অন্যদিকে কিম জং-উনও চীনের কাছে নিজেকে কেবল একজন ‘জুনিয়র পার্টনার’ বা ছোট অংশীদার হিসেবে দেখতে রাজি নন। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে তার নতুন ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে বেইজিংয়ের কাছ থেকে আরো বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবেন।
উত্তর কোরিয়া যদি তার দুই বিশাল প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে সফল হয়, তবে কিম তার পারমাণবিক কর্মসূচি আরো এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরো স্বাধীন বোধ করতে পারেন। এটি পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। কারণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় ওয়াশিংটনের সামরিক সম্পদ কমে যাচ্ছে, যা মার্কিন মিত্রদের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা চুক্তি রক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ঐক্য প্রদর্শনের পাশাপাশি কিমের মন জয়ের চেষ্টা
শি জিনপিং এই সফরের মাধ্যমে বিশ্বকে মনে করিয়ে দিতে চান যে, উত্তর কোরিয়া এখনো চীনের ওপর নির্ভরশীল এবং বেইজিংকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। এই বার্তাটি বিশ্বমঞ্চে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টারই অংশ। চীন দেখাতে চায়, ওয়াশিংটন যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বা মিত্র ও শত্রু সবার ওপর শুল্ক আরোপ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, বেইজিং তখন বিশ্বে একটি স্থিতিশীল শক্তি। অতি সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের শীর্ষ বৈঠকেও এই বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।
বাইডেন প্রশাসনের সাবেক ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট এবং এশিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান কার্ট ক্যাম্পবেল বলেন, ‘শি জিনপিং এটি প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার গণতান্ত্রিক অংশীদারদের সঙ্গে যেমন সম্পর্কের মধ্যে আছেন, শি তার কর্তৃত্ববাদী জোটের সদস্যদের সঙ্গে তার চেয়েও ভালো অবস্থানে আছেন।’
তবে শি জিনপিংয়ের এই বিরল বিদেশ সফর কিম জং-উনের মন জয়ের প্রয়োজনীয়তাকেও আন্ডারলাইন করে। ২০২৪ সালে মস্কোর সাথে স্নায়ুযুদ্ধ আমলের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করে উত্তর কোরিয়া চীনের ওপর তাদের একক নির্ভরতা কমিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য সেনা ও গোলাবারুদ সরবরাহের বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে প্রয়োজনীয় তেল, খাদ্য ও অস্ত্র প্রযুক্তি দিয়েছে। এটি চীনের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ বেইজিং উত্তর কোরিয়ার ওপর প্রভাব বজায় রেখে তার সীমানায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়।
এশিয়া সোসাইটির সিউলভিত্তিক সিনিয়র ফেলো এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসবিদ জন ডিলুরি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তা নিয়ে চীনারা নিশ্চিতভাবেই চিন্তিত। এই সফর সেই পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে এবং নিজেকে সমীকরণে ফিরিয়ে আনতে শি জিনপিংকে সাহায্য করবে।’
সাফল্যের ধারায় কিম জং-উন
কয়েক বছর আগেও কিমের পরিস্থিতি বেশ নাজুক ছিল। ২০১৯ সালে ট্রাম্প পারমাণবিক আলোচনা থেকে সরে আসায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আশা ভেস্তে যায়। পরের বছর কোভিডের কারণে সীমান্ত বন্ধ করে দেশটিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন কিম, যার ফলে চীনের সাথে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। তবে মহামারি কমে আসার পর এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সংকটের সুযোগ নিয়ে মস্কোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করে কিম তার ভাগ্য বদলে ফেলেন। রাশিয়ার কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার মূল্যের তেল, খাদ্য ও অস্ত্র সহায়তা পান তিনি।
যদিও শি জিনপিং গত মার্চে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে ট্রেন ও বিমান যোগাযোগ চালু করে কিমকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে চীনই তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক, তবুও কিম আরো সুবিধা চান। জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকা পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করতে কিম সমুদ্র সৈকত ও পাহাড়ি এলাকায় রিসোর্ট তৈরি করছেন যাতে চীনা পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যায়।
সিউলের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের বিশ্লেষক লি বিয়ং-চুল বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া এখন আর কেবল একটি মাত্র পৃষ্ঠপোষকের ওপর নির্ভরশীল কোনো অসহায় দেশ নয়। দীর্ঘদিনের লাইফলাইন চীনের পাশাপাশি তারা রাশিয়াকো নতুন কৌশলগত ডানা হিসেবে পেয়েছে।’
পারমাণবিক কর্মসূচি ও ট্রাম্পের ছায়া
এই সম্মেলনে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য কিমকে কোনো চাপ দেবেন কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও কিমের সাথে শীর্ষ বৈঠকের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এমনও হতে পারে যে ট্রাম্প পিয়ংইয়ংয়ের জন্য জিনপিংয়ের কাছে কোনো বার্তা পাঠিয়েছেন।
তবে কিম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার টেবিলে রেখে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো সংলাপে যাবেন না তিনি।
কিম তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে চীন ও রাশিয়ার ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা কমানোর উপায় এবং মার্কিন আক্রমণ থেকে রক্ষার ঢাল হিসেবে দেখেন। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার যুক্তিতে সেখানে হামলা চালানোর পর কিমের এই দৃষ্টিভঙ্গি আরো দৃঢ় হয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর অবস্থানেরও পরিবর্তন হয়েছে। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বেইজিং ও মস্কো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্তর কোরিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু দুই বছর আগে পুতিনের প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই কর্মসূচির প্রতি এক ধরনের পরোক্ষ অনুমোদন দেখা গেছে। বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার কাছে আনুমানিক ৫০টি ওয়ারহেড রয়েছে এবং তারা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য উন্নত প্রযুক্তি খুঁজছে।
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতার বিরোধী, কারণ এটি দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মার্কিন মিত্রদের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই অবস্থানের পরিবর্তন ঘটছে। তারা এখন মনে করে একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়া ওয়াশিংটন ও সিউলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়।
গত সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে জিনপিং ও কিমের বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে কোরিয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার দীর্ঘদিনের চেনা বাক্যটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। গত মাসে হোয়াইট হাউস ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের যৌথ লক্ষ্যের কথা জানালেও, চীন সরকার কেবল কোরিয় উপদ্বীপ নিয়ে ‘মতামত বিনিময়’ হয়েছে বলে মৃদু বিবৃতি দিয়েছে।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
এএম