যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জন্য রাতটি ছিল বড় সাফল্যের। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে দলটি। দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান দুর্গ হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও চমকপ্রদ জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।
টেক্সাসে সিনেট আসন জয় থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হওয়া—এবারের নির্বাচনে একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, এই ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। এমনকি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পেছনে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও সফল হতে পারেননি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক।
নির্বাচনে সবচেয়ে বড় জয় ও পরাজয়ের মুখে পড়া ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
বিজয়ী যারা
অ্যানি অ্যান্ড্রুস: নির্বাচনের অন্যতম বড় চমক দেখিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুস। রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত সাউথ ক্যারোলিনায় রিপাবলিকানদের দখলে থাকা একটি সিনেট আসন জয় করেছেন তিনি। পরাজিত করেছেন ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থী ডারলাইন গ্রাহামকে।
পেশায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রুস স্বাস্থ্যসেবা ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাব্যবস্থাকে প্রচারের প্রধান ইস্যু করেছিলেন। ১৯৯৮ সালের পর তিনিই প্রথম ডেমোক্র্যাট, যিনি সাউথ ক্যারোলিনা থেকে সিনেটর নির্বাচিত হলেন। একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম নারী সিনেটর হওয়ার ইতিহাসও গড়েছেন তিনি। তার এই জয় সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আব্দুল আল-সাইয়েদ: মিশিগানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট আব্দুল আল-সায়েদ।
জনস্বাস্থ্য খাতের সাবেক এই কর্মকর্তা নির্বাচনী প্রচারণায় নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আক্রমণের মুখে পড়েন। দলের মনোনয়ন লড়াইয়েও তাকে মূলধারার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হ্যালি স্টিভেনসের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। পরবর্তী সময়ে স্টিভেনস রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন দিয়েছিলেন।
জয়ের পর আল-সায়েদ বলেন, ‘আপনারা বেছে নিয়েছেন ঘৃণা, আর মিশিগান বেছে নিয়েছে আশা।’
চাক শুমার: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর অবস্থান না নেওয়ায় নিজ দলের মধ্যেই সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার। ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় প্রগতিশীলদেরও ক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। তবে নির্বাচনের ফলাফলে সিনেটে আবারও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হয়েছে তার।
শেরড ব্রাউন ও রয় কুপারের মতো প্রার্থীদের নির্বাচনে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন শুমার। তারা রিপাবলিকানদের দখলে থাকা সিনেট আসনগুলো জয় করেছেন। মঙ্গলবারের ফলাফল উদযাপনের সময় শুমার বলেন, ‘আমেরিকার জনগণের উদ্দেশে আমাদের পাঁচটি শব্দ—স্বস্তি আসছে।’
জেমস তালারিকো: দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর টেক্সাসে সিনেট আসন জয় করে বড় অঘটন ঘটিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো। মাত্র দুই বছর আগেও যে অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে হারিয়েছেন তিনি।
৩৭ বছর বয়সী সাবেক মিডল স্কুল শিক্ষক ও অঙ্গরাজ্য আইনপ্রণেতা তালারিকো প্রেসবাইটেরিয়ান ধর্মতত্ত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। নিজের খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় রক্ষণশীলদের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন তিনি।
তবে প্রচারণায় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছিল। বিশেষ করে প্যাক্সটনের পক্ষে ইলন মাস্কের মতো ধনীদের আর্থিক সমর্থনের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন তালারিকো।
পরাজিত যারা
বিবেক রামাস্বামী: ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বায়োটেক খাতের ধনকুবের বিবেক রামাস্বামী ওহাইওর গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটনের কাছে পরাজিত হয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে একটি বিতর্কিত বিজ্ঞাপন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন রামাস্বামী। বিজ্ঞাপনটিতে অ্যাকটনের বিচ্ছিন্ন মায়ের অভিযোগ তুলে ধরে তার কঠিন শৈশবের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
তবে বিজ্ঞাপনে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে যাওয়া হয়। অ্যাকটনের সৎবাবার বিরুদ্ধে তাকে শৈশবে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর তার মা সন্তানের অভিভাবকত্ব হারিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপনটি প্রচারে প্রায় ১০ লাখ ডলার ব্যয় করা হলেও ব্যাপক সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় রামাস্বামীর প্রচারশিবির।
হ্যালি স্টিভেনস: মিশিগানের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেনসও নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছেন। প্রথমে সিনেটের দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে আব্দুল আল-সায়েদের কাছে হেরে যান তিনি। পরে নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে আল-সায়েদের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানান।
ইসরাইল নিয়ে আল-সায়েদের সমালোচনা এবং একটি বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন স্টিভেনস। ওই বিজ্ঞাপনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছিল, যা আল-সায়েদ অস্বীকার করেন।
শেষ পর্যন্ত আল-সায়েদ জয়ী হলেও স্টিভেনস নিজ দলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। এমনকি তার নির্বাচনী প্রচারশিবিরের কয়েকজন সদস্যও পদত্যাগ করেন।
ইলন মাস্ক: রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে ৪০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেও প্রত্যাশিত ফল পাননি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। তার সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনে পরাজিত কেন প্যাক্সটনও রয়েছেন।
নির্বাচনের ফলাফলের পর মাস্কের সামনে নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (ডজ)-এর নেতৃত্ব এবং তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ফেডারেল সরকারের চুক্তি নিয়ে তদন্তের মুখে পড়তে পারেন তিনি।
কংগ্রেসের নথি তলবের ক্ষমতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা প্রয়োজনে মাস্ককে শপথের অধীনে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্যও তলব করতে পারবেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প: এবারের নির্বাচনে সরাসরি প্রার্থী না হলেও সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কাগুলোর একটি এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় তার প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছর কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলিনার মতো দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান ঘাঁটিতেও ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীরা সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন।
এর ফলে মেয়াদের বাকি সময় ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে ট্রাম্পকে। নতুন কংগ্রেস তার আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দিতে, প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদন্ত করতে এবং কথিত অনিয়মের জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে। ফলে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ট্রাম্পকে বিরোধী দলের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা