হোম > বিশ্ব > আমেরিকা

নির্বাচনের পর ট্রাম্পের মুখোমুখি ডেমোক্র্যাটরা, বিভক্ত সরকারের পথে ওয়াশিংটন

আমার দেশ অনলাইন

ছবি: সংগৃহীত।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার লাগাম টানতে চায় ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে, নির্বাহী বিভাগের বিস্তৃত ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিজের অবস্থান ধরে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। এতে ওয়াশিংটনে আগামী দুই বছর আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে বড় ধরনের জনসমর্থন তৈরি হয়। এর ফলে সিনেটে অন্তত ৫৪-৪৪ আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে দলটি। পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও অন্তত ২৫টি আসন বাড়িয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে তারা।

২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করা রিপাবলিকান ট্রাম্পের জন্য এবারই প্রথম ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে হবে।

বুধবার এমএস নাউকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস বলেন, গত দুই বছরে সরকারের দুর্নীতি ও বিভিন্ন নীতির নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি মার্কিন জনগণ বুঝতে পেরেছে। অন্যায়কারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ডেমোক্র্যাটরা কাজ করবে।

নিউইয়র্কের এই আইনপ্রণেতা বলেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ডেমোক্র্যাটরা কাজ করবেন। একই সঙ্গে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরুর আগেই ইরানের বিরুদ্ধে আট মাস ধরে চলা অজনপ্রিয় যুদ্ধ বন্ধ করতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পরিচিত লাল রঙের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) টুপির একটি ছবি পোস্ট করেন ট্রাম্প। এতে প্রচলিত স্লোগানের পরিবর্তে লেখা ছিল ‘ভেটো’। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তার সমর্থন ছাড়া আইন প্রণয়নে যে সীমাবদ্ধতা থাকবে, সেটিই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

ছবি: সংগৃহীত।

সিনেটে রিপাবলিকান নেতা জন থুনও ট্রাম্পের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাট পার্টির বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক অংশ সরকারের নেওয়া সব পদক্ষেপ বাতিলের চেষ্টা করলে রিপাবলিকানরা চুপ করে বসে থাকবে না। ডেমোক্র্যাটদের চরমপন্থা ঠেকাতে তারা ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করবেন।

টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও কানসাসে ডেমোক্র্যাটদের জয়

মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডের ওপর গণভোট হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ট্রাম্প। এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের বারবার বলেছিলেন, ‘মনে করুন, আমিও নির্বাচনে প্রার্থী।’

ছবি: সংগৃহীত।

তবে ফলাফলে দেখা গেছে, দুই বছর আগে ট্রাম্পকে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসানো রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটারদের বড় একটি অংশ এবার ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং দেশ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ এর অন্যতম কারণ।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি টেক্সাসে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো অঙ্গরাজ্যটিতে সিনেট আসন জিতেছে দলটি। পাশাপাশি তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকেও পরাজিত করেছেন তাদের প্রার্থী।

প্রায় এক শতাব্দী পর কানসাসে প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প প্রায় ১৮ শতাংশ ব্যবধানে জয়ী হওয়া সাউথ ক্যারোলাইনায় তার মনোনীত সিনেট প্রার্থীকেও হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।

ছবি: সংগৃহীত।

বুধবার সকাল পর্যন্ত আলাস্কা ও মিসিসিপির সিনেট নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়নি। এ দুটি আসনেও জয় পেলে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৫৬-৪৪ হতে পারে।

জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে ট্রাম্প প্রশাসন, তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কর্মকাণ্ড তদন্তে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রেও সরকারের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করবেন তারা। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিচারপতির পদ শূন্য হলে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীর নিয়োগ আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে।

তবে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত আইনসভার নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতেই থাকছে। ডিসেম্বরের পর কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম চালু রাখতে অর্থায়ন বিল পাস করা জরুরি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিদায়ী কংগ্রেসের অধিবেশনে নিজেদের রক্ষণশীল নীতির বাস্তবায়ন করতে পারে রিপাবলিকানরা।

ছবি: সংগৃহীত।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না ট্রাম্প। তবে গত প্রায় এক দশক ধরে রিপাবলিকান পার্টির ওপর তার শক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাতেই কিছুটা সমঝোতামূলক সুরে ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, তারা ‘ভালো কাজ’ করেছেন।

ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে বলে স্বীকার করলেও নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছেন ট্রাম্প। অভিবাসনসহ কয়েকটি বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে তাদের পাস করা কোনো ‘উন্মাদনাপূর্ণ’ বিলে ভেটো দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে সামনে রেখে প্রচার

নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। তাদের অভিযোগ, আমদানিপণ্যের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা উচ্চ শুল্ক এবং ইরান যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়েছে। এসব শুল্কের কয়েকটিকে আদালত অবৈধ কর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্পের পরিবারের বিপুল অর্থ উপার্জনের বিষয়টিও প্রচারে তুলে ধরে দলটি।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে রিপাবলিকানরা ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অধিকারসহ বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানের সমালোচনা করে দলটিকে উগ্র ও চরমপন্থি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তবে নির্বাচনের ফল বলছে, ভোটারদের কাছে এসব বিষয়ের চেয়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত।

রয়টার্স ও ইউএসএ টুডের সংকলিত ফল অনুযায়ী, ভোট গণনা হওয়া প্রায় ২ হাজার ১০০ কাউন্টির মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া প্রায় সব জায়গাতেই সমর্থন হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। ধনী ও দরিদ্র—উভয় ধরনের কাউন্টিতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী বেশি কিংবা কম—দুই ধরনের এলাকার ভোটারদের মধ্যেও দলটির অগ্রগতি দেখা গেছে।

বিশেষ করে লাতিনো জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি এমন এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে রয়েছে টেক্সাসের সীমান্তবর্তী কাউন্টি, যেখানে ২০২৪ সালে ট্রাম্পের পক্ষে ভোটের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। কানসাসের কৃষিপ্রধান শহরগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেড়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা দুই ডজনের বেশি আসন নিজেদের করে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হওয়া হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সব আসনেই জয় পেয়েছে দলটি। এমনকি দুই বছর আগে ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, এমন প্রায় এক ডজন আসনেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।

মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের উদীয়মান বামপন্থী অংশের প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ জয়ী হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও এফবিআই কর্মকর্তা মাইক রজার্স। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া রজার্স নির্বাচনী প্রচারে মিশিগানে জন্ম নেওয়া মিশরীয় বংশোদ্ভূত আল-সাইয়েদকে ধর্মীয় উগ্রপন্থি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।

ছবি: সংগৃহীত।

মঙ্গলবার রাতে সমর্থকদের উদ্দেশে আল-সাইয়েদ বলেন, ‘আপনারা ঘৃণাকে বেছে নিয়েছিলেন, আর মিশিগান বেছে নিয়েছে আশাকে।’ এ সময় তিনি রজার্সকে ইঙ্গিত করেন।

এবারের নির্বাচনে দুই দলের জন্যই বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কিশা ল্যান্স বটমস যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর হয়েছেন। নিউ মেক্সিকোয় ডেমোক্র্যাট ডেব হাল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।

ছবি: সংগৃহীত।

এ ছাড়া টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসা অঙ্গরাজ্যটির প্রথম লাতিনা গভর্নর হতে যাচ্ছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রথম লাতিনো গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাট জাভিয়ের বেসেরা।

সূত্র: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় জয়ী ও পরাজিত হলেন যারা

ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে পাস হওয়া বিল কি আদৌ আটকে দিতে পারবেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রগতিশীলদের জয় দেখছেন বার্নি স্যান্ডার্স

টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া ও মিশিগানসহ আরো কয়েকটি আসনে ডেমোক্র্যাটদের জয়

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবির পরও ইরান যুদ্ধকে সার্থক মনে করেন ট্রাম্প

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ, আবারো অভিশংসনের আশঙ্কায় ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটদের উত্থান, রাজনীতিতে এক প্রজন্মের বড় পরিবর্তন

ডেমোক্র্যাটদের পাস করা আইন কি ভেটো দিয়ে আটকে দিতে পারবেন ট্রাম্প

‘ট্রাম্পই এখনো আপনাদের প্রেসিডেন্ট’, কেন এমন বার্তা দিল হোয়াইট হাউস

ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় ব্রিটিশ মডেল অনুসরণ করতে চায় মার্কিন ডেমোক্র্যাটরা