হোম > বিশ্ব > এশিয়া

ভুটানে নির্বাচনি সহযোগিতা বাড়াচ্ছে ভারত

আমার দেশ অনলাইন

ভারত ও ভুটানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি তুলনামূলক কম আলোচিত ক্ষেত্র এখন ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে—নির্বাচনি প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ১৪ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর ভুটান সফর এবং দেশটির জাতীয় ভোটার দিবসের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এই প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে। সফরের কর্মসূচিতে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক, প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে এবং দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও ছিল।

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল ১৫ সেপ্টেম্বর ভুটানের জাতীয় ভোটার দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া। পারোতে জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক স্কুল অব ল-এ আয়োজিত অনুষ্ঠানে জ্ঞানেশ কুমার প্রধান অতিথি ছিলেন। ভুটানের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জাতীয় ভোটার দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘রিইম্যাজিনিং ডেমোক্রেসি: সেলিব্রেটিং পার্টনারশিপ, ইন্সপায়ারিং পার্টিসিপেশন’—অর্থাৎ গণতন্ত্রকে নতুনভাবে ভাবা, অংশীদারত্বকে উদ্‌যাপন করা এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা।

এই সফরের তাৎপর্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সফর বা জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের নির্বাচন কমিশন ও ভুটানের নির্বাচন কমিশনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্বের দুই দশক পূর্ণ হয়েছে ২০২৬ সালে। ভুটানের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুই দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে এই সহযোগিতা নির্বাচনী জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময় থেকে বিস্তৃত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, পেশাগত বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এর আগে ২০২৫ সালের মার্চেও ভারতের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেকশন ম্যানেজমেন্টে (আইআইআইডিইএম) ভুটানের ৪০ জন জ্যেষ্ঠ ও মধ্যপর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাকে নিয়ে দুই সপ্তাহের একটি আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভারতের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, নির্বাচন প্রশাসন বিষয়ে এই সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল দুই দেশের নির্বাচনী সহযোগিতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্পর্ককে আরো গভীর করা।

নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ ধরনের সহযোগিতার বাস্তব ক্ষেত্র বিস্তৃত। ভোটার নিবন্ধন ও তালিকা ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন পরিচালনা, ভোটার সচেতনতা, নির্বাচনী প্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, নির্বাচন-পরবর্তী মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ে দেশগুলো পরস্পরের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারে। ভুটানের নির্বাচন কমিশনের ২০২৬ সালের জাতীয় ভোটার দিবসের কর্মসূচিতে ডিজিটাল কর্নার, ভোটিং প্রসেস, শিক্ষা হাব এবং নির্বাচনী প্রযুক্তি প্রদর্শনের মতো উদ্যোগও ছিল। ফলে নির্বাচনী সহযোগিতার বিষয়টি কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারিগরি ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নেই; নাগরিক অংশগ্রহণ ও নির্বাচনী সেবার আধুনিকায়নের সঙ্গেও তা যুক্ত হচ্ছে।

তবে ভারত-ভুটান সম্পর্কের বৃহত্তর কাঠামো বিবেচনায় নিলে এই সহযোগিতার আরেকটি দিকও সামনে আসে। দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। ভারতের থিম্পুস্থ দূতাবাসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে বিচারিক সহযোগিতা, সংসদীয় সম্পর্ক, নিরীক্ষা এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয় রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনগুলোর মধ্যে সহযোগিতাকে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের একটি অংশ হিসেবেই দেখা যায়। নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। তাই এ ধরনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সমার্থক করা যেমন যথাযথ নয়, তেমনি এর কৌশলগত গুরুত্ব একেবারে অস্বীকার করাও বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা হবে না। নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত যোগাযোগ পারস্পরিক আস্থা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে ভুটানের মতো একটি ছোট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে নিয়মিত নির্বাচন পরিচালনা, ভোটার অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনী সেবা আধুনিকায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। অন্যদিকে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার আকার ও প্রশাসনিক জটিলতা অনেক বড়। ফলে দুই দেশের বাস্তবতা এক নয়; বরং ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যেও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার কিছু অভিজ্ঞতা পারস্পরিকভাবে বিনিময় করা সম্ভব।

এখানে প্রযুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা, তথ্য ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, ভোটার শিক্ষা এবং নির্বাচনী কর্মীদের প্রশিক্ষণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ভুটানের জাতীয় ভোটার দিবসের কর্মসূচিতেও ডিজিটাল ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক উদ্যোগের উপস্থিতি দেখা গেছে। একইভাবে ভারতও নির্বাচন পরিচালনায় প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ব্যবস্থার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় দুই দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাপনার একটি সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র।

তবে নির্বাচনী সহযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত প্রতিটি দেশের নিজস্ব সাংবিধানিক কাঠামো ও প্রয়োজনের প্রতি সম্মান। নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি, ভোটার আচরণ, রাজনৈতিক দলব্যবস্থা, আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিটি দেশের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে একটি দেশের পদ্ধতি অন্য দেশে সরাসরি প্রয়োগের চেয়ে অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বিনিময় অধিক কার্যকর হতে পারে।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভুটান সফর সেই অর্থে একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক ধারার অংশ। সফরে রাজা ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের যোগাযোগকে প্রতিফলিত করেছে; একই সঙ্গে জাতীয় ভোটার দিবসে অংশগ্রহণ এবং দুই নির্বাচন কমিশনের দীর্ঘ সহযোগিতার প্রসঙ্গ নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ককে সামনে এনেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ ধরনের আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। নির্বাচন কেবল ভোট গ্রহণের দিনের একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; এর সঙ্গে ভোটার তালিকা, নাগরিক শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রশাসনিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের মতো বিষয় জড়িত। ফলে নির্বাচন কমিশনগুলোর মধ্যে নিয়মিত অভিজ্ঞতা বিনিময় আঞ্চলিক পর্যায়ে নির্বাচনী প্রশাসনের পেশাগত মানোন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ভুটানে ভারতের নির্বাচনী সহযোগিতা মূলত দুই দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগের ধারাবাহিকতা। ২০২৬ সালের সফর সেই সম্পর্ককে আরো দৃশ্যমান করেছে। এটিকে একদিকে যেমন বৃহত্তর ভারত-ভুটান সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে নির্বাচনী প্রশাসন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিয়ে পারস্পরিক শেখার একটি ক্ষেত্র হিসেবেও দেখা যায়। ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা কতটা বিস্তৃত হয়, তা নির্ভর করবে দুই দেশের নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব প্রয়োজন, অগ্রাধিকার ও পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর, ইন্ডিয়া টুডে, দ্য প্রিন্ট, ডিডি ইন্ডিয়া, নিউজ অন এয়ার, আকাশবাণী নিউজ, ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো, ভুটানের নির্বাচন কমিশন, ভারতের নির্বাচন কমিশন ও ভারতের থিম্পুস্থ দূতাবাস ইত্যাদি।

দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে ঢাকা

বিদ্যুৎব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতার বিকল্প সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ

দেশের বাইরেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন আফগান নারীরা

মায়েরা শুধু পরিবারের অভিভাবক নন, শান্তির নির্মাতাও

হেগের রায়ের পরও বিরোধে ভারত-পাকিস্তান, সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ কী

ভারত-চীনের আট দফা সমঝোতার পরও আস্থার সংকট বহাল

বৃহৎ মহানগর অঞ্চলে পরিণত হয়েছে ইসলামাবাদ

যৌথ সীমান্ত কমিশন চালু করল পাকিস্তান-চীন, ভারতের তীব্র আপত্তি

জাতীয় প্রতিরক্ষার অন্যতম স্তম্ভ নিরাপদ ও বিশ্বস্ত যোগাযোগ

বিদেশি শ্রমের ওপর নির্ভরশীল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার