আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগান নারীদের জীবন, অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে এখন আফগানিস্তানের সীমানার বাইরে নানা ক্ষেত্রে সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে। অভিবাসন, আশ্রয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী নীতির কঠোরতার মধ্য দিয়ে আফগান নারীদের একটি অংশ নতুন ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে নাজিরা হাজি জাদার বহিষ্কারের ঘটনা সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ।
যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো ‘এলিয়েন টেররিস্ট রিমুভাল কোর্ট’ বা এটিআরসি ব্যবহার করে ৪৭ বছর বয়সী আফগান নারী নাজিরা হাজি জাদাকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠিয়েছে। ১৯৯৬ সালে মার্কিন কংগ্রেস এই বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করলেও ২০২৬ সালের আগে আদালতটি কখনো কোনো মামলায় ব্যবহৃত হয়নি। হাজি জাদার মামলাই এটিআরসির প্রথম মামলা এবং তার বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা এই বিশেষ আইনি কাঠামোর প্রথম প্রয়োগ ঘটল।
নাজিরা হাজি জাদা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে বসবাস করতেন এবং তার বৈধ স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা ছিল। মার্কিন বিচার বিভাগ অভিযোগ করে, তিনি তার ছেলে আবদুল্লাহ হাজি জাদা ও জামাতা নাসির আহমাদ তাওহেদির মাধ্যমে ইসলামিক স্টেট বা আইএস-অনুপ্রাণিত ২০২৪ সালের নির্বাচনের দিন একটি গণহামলার ষড়যন্ত্রে সহায়তা করেছিলেন এবং পরিবারের মধ্যে আইএসের মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে তিনি নিজে ওই হামলার পরিকল্পনা নিয়ে কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হননি। তার ছেলে ও জামাতা সংশ্লিষ্ট মামলায় দোষ স্বীকার করেছেন।
মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, আবদুল্লাহ ও তাওহেদি ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর হামলার জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহের সময় গ্রেপ্তার হন। আবদুল্লাহ তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও পরে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দোষ স্বীকার করে ১৫ বছরের কারাদণ্ড পান। জামাতা তাওহেদি ইসলামিক স্টেটকে সহায়তার ষড়যন্ত্রসহ সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন এবং তার সাজা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছিল।
এই মামলায় মার্কিন সরকারের ব্যবহৃত আইনি পদ্ধতিই ঘটনাটিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এটিআরসি এমন একটি কাঠামো, যার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট শ্রেণিবদ্ধ তথ্য প্রকাশ না করেও কোনো অ-মার্কিন নাগরিককে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া চালানো যায়। প্রচলিত ফৌজদারি মামলায় ‘যুক্তিসংগত সন্দেহাতীতভাবে’ অপরাধ প্রমাণের যে মানদণ্ড থাকে, এই ধরনের বহিষ্কার প্রক্রিয়ায় তা প্রযোজ্য নয়; বরং অপেক্ষাকৃত নিম্ন প্রমাণমানদণ্ডে বহিষ্কারের বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে।
এ কারণেই নাজিরা হাজি জাদার আইনজীবীরা আদালতের কার্যক্রম ও শ্রেণিবদ্ধ তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে গুরুতর আপত্তি তোলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, সরকারের কাছে থাকা প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসামিপক্ষ বা তার আইনজীবীরা পর্যাপ্তভাবে দেখতে না পারলে কার্যকর আইনি প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা কঠিন হয়। আইনজীবীরা আদালতের সাংবিধানিক বৈধতা এবং ডিউ প্রসেস বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্নও তুলেছেন।
তবে মার্কিন সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিচার বিভাগ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ঘটনাটিকে জাতীয় নিরাপত্তার সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তা বা সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের সব আইনগত ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। ২০ আগস্ট এটিআরসি বহিষ্কারের আদেশ দেয় এবং পরে আদালতের নথি প্রকাশ করা হয়। নাজিরা হাজি জাদা বহিষ্কারে সম্মতি জানান এবং আপিলের অধিকার ত্যাগ করেন। এরপর তাকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়।
ঘটনাটির গুরুত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা পুনর্দখলের পর বিপুলসংখ্যক আফগান নাগরিক দেশ ছাড়েন। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশী দেশগুলোতে, কেউ ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, আবার কেউ বিভিন্ন দেশে দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন বা পুনর্বাসনের সুযোগ খুঁজেছেন। ফলে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন অন্য দেশগুলোর আশ্রয়, অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
বিশেষ করে আফগান নারীদের ক্ষেত্রে বাস্তবতাটি আরো জটিল। দেশের ভেতরে তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাচল ও জনজীবনে অংশগ্রহণ নিয়ে ব্যাপক বিধিনিষেধ তৈরি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আফগান নারীদের অধিকার একটি বড় মানবাধিকার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে বিদেশে থাকা আফগান নাগরিকদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা যাচাই, অভিবাসন নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ নতুন ধরনের বাস্তবতা তৈরি করেছে। ফলে একজন আফগান নারী বিদেশে অবস্থান করলেও তার আইনি ও নিরাপত্তাগত অবস্থান নিজ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকছে না।
নাজিরা হাজি জাদার ঘটনা অবশ্য আফগান নারীদের সামগ্রিক অভিবাসন পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্ব করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এটি একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট জাতীয় নিরাপত্তা অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিচালিত বিশেষ আইনি প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের অভিযোগ এবং তার আইনজীবীদের আপত্তি—দুই পক্ষের বক্তব্যই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে তিনি নিজে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত না হওয়ায় তার ক্ষেত্রে বহিষ্কার ও অপরাধের দায়ের মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট রাখা জরুরি।
তারপরও ঘটনাটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে: জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় রাষ্ট্র কতদূর পর্যন্ত বিশেষ আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে এবং সেই ক্ষমতার সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির যথাযথ আইনি অধিকারের ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। শ্রেণিবদ্ধ তথ্য জাতীয় নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ করা সম্ভব না হলে আদালত কীভাবে আসামিপক্ষের ন্যায্য প্রতিরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করবে—এ প্রশ্নটি ভবিষ্যতে এই আদালতের কার্যক্রম নিয়ে আরো আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
এটিআরসির প্রথম মামলাটি তাই একটি নজিরও তৈরি করেছে। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় তিন দশক আদালতটি নিষ্ক্রিয় ছিল। এখন এর ব্যবহার শুরু হওয়ায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র একই আইনি কাঠামো আরো অভিবাসন মামলায় ব্যবহার করবে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নাজিরা হাজি জাদার আইনজীবীরা ইতিমধ্যেই আদালতের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে ভবিষ্যৎ কোনো মামলায় এই প্রশ্নগুলো আরও স্পষ্টভাবে বিচারিক পর্যালোচনার সামনে আসতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকেও ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব এখন কেবল কাবুল, কান্দাহার বা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। শরণার্থী প্রবাহ, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং মানবিক সহায়তার প্রশ্নে পাকিস্তান, ইরানসহ প্রতিবেশী দেশগুলো যেমন প্রভাবিত হচ্ছে, তেমনি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অভিবাসননীতিতেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
নাজিরা হাজি জাদার বহিষ্কার সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ। এখানে একই সঙ্গে তিনটি প্রবণতা কাজ করছে—আফগানিস্তান থেকে মানুষের দেশত্যাগ, আশ্রয়প্রার্থী ও অভিবাসীদের নিরাপত্তা যাচাইয়ের কঠোরতা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর বিশেষ আইনি ক্ষমতার ব্যবহার। এই তিনটির সংযোগ ভবিষ্যতে আফগান নাগরিকদের বিদেশে অবস্থান ও আইনি নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে আফগান নারীদের বিদেশের বাস্তবতা শুধু নিরাপত্তা ও বহিষ্কারের গল্প নয়। বহু আফগান নারী বিদেশে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানবাধিকার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নতুন জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তারা নিজেদের পরিবার ও দেশে থাকা স্বজনদের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছেন। ফলে আফগান নারীদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে কেবল অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
২০২১-পরবর্তী আফগান বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো—দেশটির সংকট এখন আর শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা নয়। এর প্রভাব সীমান্ত অতিক্রম করে অভিবাসন, মানবাধিকার, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন ও বৈদেশিক নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। নাজিরা হাজি জাদার ঘটনা সেই বহুমাত্রিক বাস্তবতার একটি নতুন অধ্যায়, যেখানে একজন আফগান নারীর ব্যক্তিগত আইনি অবস্থান একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিবাসননীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস ও রয়টার্স