ওষুধের মানোন্নয়ন ও দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে তালেবান সরকার আফগানিস্তানের ওষুধ বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত এই রদবদলের ফলে সরবরাহ ও দামের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
রাজধানী কাবুল থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, নভেম্বরে তালেবান কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় যে পাকিস্তান থেকে দীর্ঘদিনের ওষুধ আমদানিনির্ভরতা শিগগিরই বন্ধ করা হবে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল কাইয়ুম নাসির বলেন, আমদানিকারকদের ‘বিকল্প ও বৈধ’ উৎস খুঁজে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের সময়সীমা রাখা হলেও আগের চুক্তি শেষ করা ও শুল্ক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে আফগানিস্তান তার অর্ধেকেরও বেশি ওষুধ পাকিস্তান থেকে আমদানি করত।
কাবুলের ফার্মাসিস্ট মুজিবুল্লাহ আফজালি জানান, কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে এবং কিছু ওষুধ বাজারে মিলছে না, ফলে রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। এখন অন্যান্য দেশ থেকে ওষুধ আনায় পরিবহন সময় ও ব্যয় বেড়েছে। তিনি বলেন, ইরান সীমান্তের ইসলাম কালা পথ দিয়ে ওষুধ আনতে গিয়ে তার পরিবহন ব্যয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওষুধশিল্পের এক ব্যক্তি জানান, আগে মোট ব্যয়ের ৬-৭ শতাংশ ছিল পরিবহন খরচ, যা এখন বেড়ে ২৫-৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তার ভাষায়, আগে পাকিস্তানে যোগাযোগ করলেই দুই-তিন দিনের মধ্যে দ্রুত সরবরাহ পাওয়া যেত।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শরাফাত জামান বলেন, পাকিস্তান থেকে আসা নকল ও ভেজাল ওষুধ বড় সমস্যা ছিল, যা বাজার সংস্কারের অন্যতম কারণ। তিনি জানান, ইরান, ভারত, বাংলাদেশ, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, চীন ও বেলারুশসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। তার মতে, ভারত আগে বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকায় সেখান থেকে ঘাটতি পূরণ সম্ভব।
তিনি আরও দাবি করেন, দেশে ৬০০ ধরনের ওষুধ উৎপাদন শুরু হওয়ায় অনেক রোগীর সমস্যা কমেছে। আফগান প্রতিষ্ঠান মিল্লি শিফা ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিদিন এক লাখ বোতল অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ধরনের সেরাম উৎপাদন করছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নাসার আহমদ তারাকি। চাহিদা বাড়লে উৎপাদন দ্বিগুণ করার সক্ষমতাও রয়েছে বলে তার দাবি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা, উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও সীমিত অবকাঠামোর কারণে দেশটি এখনো পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে পারবে না। তিন মাসে শিল্প পুনর্গঠনও বাস্তবসম্মত নয় বলে তারা মনে করেন।
কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় ওষুধ পাকিস্তানি ওষুধের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে অনেক ভোক্তার মধ্যে পাকিস্তানি ওষুধের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে বলেও জানান শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসকরাও নতুন পরিস্থিতিতে চাপের মুখে পড়েছেন। কাবুলের এক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বলেন, চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন পরিবর্তন, বিকল্প ওষুধ খোঁজা এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা সংশোধনে বাড়তি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। তার সতর্কবার্তা, পাকিস্তান-নির্ভরতা কমানোর এ পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে চিকিৎসা সেবাকে জটিল করে তুলছে এবং রোগীদের চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এসআর