নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ানের সমালোচক এবং গুলেন আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি চালানোর অভিযোগ উঠেছে তুর্কি গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবিরোধী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ছবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বিশ্লেষণ করে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে সংগৃহীত তথ্য তুরস্কে চলমান ফৌজদারি তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয়।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট তৈরি করা একটি গোপন নথিতে তিনটি নর্ডিক দেশে বিক্ষোভকারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তা তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠানোর বিবরণ রয়েছে। নথিটি তুরস্কের আন্তালিয়া প্রাদেশিক পুলিশ বিভাগের। এতে ২৪ জুন নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই বিক্ষোভগুলো ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় কাউন্সিলের সদর দপ্তরের বাইরে অনুষ্ঠিত একটি প্রতিবাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, তুরস্ক যেন ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের রায়গুলো বাস্তবায়ন করে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে গুলেন আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিরাও ছিলেন।
নথিতে বলা হয়েছে, তুর্কি কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও পোস্ট পর্যালোচনা করে বিক্ষোভকারীদের নামের তালিকা তৈরি করে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের অংশগ্রহণের প্রমাণ হিসেবে কিছু ছবির স্ক্রিনশটও সংরক্ষণ করা হয়। পরে এসব তথ্য তুরস্কের জাতীয় পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী বিভাগে পাঠানো হয়।
আদালতে পাঠানো হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন
নথি অনুযায়ী, তুরস্কের জাতীয় পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী বিভাগ ১১ আগস্ট প্রাদেশিক পুলিশ ইউনিটগুলোকে নির্দেশনা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্তালিয়া প্রাদেশিক পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী শাখা ১৯ আগস্ট একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে বিদেশে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই, তাদের বিরুদ্ধে তুরস্কে আগে থেকে কোনো বিচারিক কার্যক্রম চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট আদালত ও কৌঁসুলিদের কাছে পাঠানোর নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তালিয়া পুলিশের তৈরি একটি তদন্ত প্রতিবেদন সেখানকার দ্বিতীয় উচ্চ ফৌজদারি আদালতে পাঠানো হয়েছিল। ওই নথিতে অন্তত একজন ব্যক্তির পরিচয় ও বিক্ষোভে অংশগ্রহণের তথ্য যুক্ত করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম, তুরস্কের জাতীয় পরিচয় নম্বর ও অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য প্রকাশ করেনি নর্ডিক মনিটর। সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি ব্রিটিশ নাগরিক।
নজরদারির তথ্য প্রথম কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে নথিতে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ছবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পর্যালোচনার কথা বলা হলেও, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে সরাসরি গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্যও প্রকাশিত হয়নি।
প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে প্রকৃত গোয়েন্দা তৎপরতার উৎস আড়াল করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি সংবাদমাধ্যমটির মূল্যায়ন; নথি থেকে সরাসরি গোপন মাঠপর্যায়ের নজরদারির বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না।
গুলেন আন্দোলন ঘিরে বিরোধ
গুলেন আন্দোলন তুরস্কের প্রয়াত ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনের আদর্শে অনুপ্রাণিত একটি ধর্মভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন। শিক্ষা, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও আন্তধর্মীয় সংলাপের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মাধ্যমে দেশটির বাইরে পর্যন্ত আন্দোলনটির বিস্তার ঘটেছিল।
২০১৩ সালে তুরস্কে দুর্নীতির তদন্ত ঘিরে এরদোয়ান সরকারের সঙ্গে আন্দোলনটির বিরোধ তীব্র হয়। পরে ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের জন্য তুরস্কের সরকার গুলেন আন্দোলনকে দায়ী করে। আন্দোলনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দেশটিতে ব্যাপক ধরপাকড়, তদন্ত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গুলেন আন্দোলন অবশ্য অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গুলেন আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেই কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা নির্দিষ্ট প্রমাণ, ব্যক্তিগত দায় এবং ন্যায়বিচারের স্বীকৃত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত গুলেন আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত অনেক ব্যক্তি তুরস্কের ধরপাকড়ের পর দেশ ছেড়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় বা অন্য ধরনের আইনি সুরক্ষাও পেয়েছেন। কিন্তু বিদেশে বসবাসের পরও তুরস্কের কর্তৃপক্ষ তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করছে বলে সাম্প্রতিক নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আগেও উঠেছে নজরদারির অভিযোগ
বিদেশে বসবাসরত এরদোয়ান সরকারের সমালোচকদের বিষয়ে তুর্কি কর্তৃপক্ষের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ নতুন নয়। নর্ডিক মনিটর ২০২৬ সালের ১১ জুন প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ২০২৫ সালের ২৫ জুন অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওপর নজরদারির অভিযোগ তুলেছিল।
তুর্কি সরকারি নথির বরাতে বলা হয়, স্ট্রাসবুর্গের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে সংগ্রহ করা তথ্য তুরস্কের পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। পরে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রমেও ওই তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
নরওয়েতে তুর্কি দূতাবাসের মাধ্যমে এরদোয়ান সরকারের সমালোচক ও গুলেন আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও আগে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২১ সালে নর্ডিক মনিটর জানায়, নরওয়েতে বসবাসরত তুর্কি ও নরওয়েজীয় নাগরিকদের বিষয়ে কূটনৈতিক সূত্রে সংগ্রহ করা তথ্য তুরস্কের একটি সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত তদন্তে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের কারণ, বিদেশে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া কোনো ব্যক্তির তথ্য নিজ দেশে ফৌজদারি মামলায় ব্যবহৃত হলে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা কিংবা শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশ নেওয়ার কারণে কেউ নজরদারি বা তদন্তের আওতায় এলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের আইনি সুরক্ষা রয়েছে। এসব দেশে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের অংশগ্রহণকারীদের তথ্য অন্য একটি দেশের কর্তৃপক্ষ সংগ্রহ করে নিজ দেশের তদন্ত বা বিচারিক কার্যক্রমে ব্যবহার করলে তা আন্তদেশীয় নজরদারি ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
নতুন নথির বিষয়ে আরেকটি প্রশ্ন হলো, সংশ্লিষ্ট তিন দেশের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এসব বিক্ষোভের ওপর তুর্কি কর্তৃপক্ষের নজরদারি কিংবা সংগৃহীত তথ্য তুরস্কের আদালতে পাঠানোর বিষয়টি জানত কি না। নর্ডিক মনিটরের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
তুরস্কের নিরাপত্তা সংস্থা, প্রাদেশিক পুলিশ ও বিচার বিভাগের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের যে প্রক্রিয়ার বিবরণ নথিতে রয়েছে, তা বিদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করে নিজ দেশের তদন্তে ব্যবহারের একটি সম্ভাব্য কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। তবে নজরদারির সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি, তথ্য সংগ্রহের মূল উৎস এবং সংশ্লিষ্ট তিন দেশের কর্তৃপক্ষের ভূমিকা সম্পর্কে আরো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে তুর্কি সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কি না, তা নর্ডিক মনিটরের প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়াও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র: নর্ডিক মনিটর, ওয়াইএলই নিউজ ও তুর্কিশ মিনিট