রাশিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় তুয়াপসে শহরের তেল শোধনাগার ও টার্মিনালে ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে চারবার হামলার শিকার হওয়া এই শোধনাগারে গত শুক্রবারও নতুন করে আগুন লেগেছে। এই অগ্নিকাণ্ড থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ার প্রভাবে ওই এলাকায় ‘কালো বৃষ্টি’ পড়ছে এবং প্রায় ৩০ মাইল উপকূলীয় এলাকা তেল ছড়িয়ে দূষিত হয়ে পড়েছে। পরিবেশবাদীরা একে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার অন্যতম ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অগ্নিকাণ্ড থেকে সৃষ্ট ঘন কালো ও ঝাঝালো ধোঁয়া তুয়াপসে শহরের আকাশ ঢেকে ফেলেছে। এই ধোঁয়া থেকে বৃষ্টির মতো তৈলাক্ত ও বিষাক্ত ফোঁটা বাসিন্দাদের ওপর পড়ছে, যাকে স্থানীয়রা ‘কালো বৃষ্টি’ বলছেন।
পরিবেশ রক্ষা গ্রুপ ‘ইকোডিফেন্স’-এর প্রধান ভ্লাদিমির স্লিভিয়াক সতর্ক করে বলেছেন, ‘বাতাসে ক্যান্সারের কারণ হতে পারে এমন বেনজিনের মতো ক্ষতিকর উপাদান মিশে গেছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।’
দূষণের কারণে উপকূলীয় এলাকায় মৃত মাছ ও ডলফিন ভেসে আসতে দেখা গেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত সপ্তাহে হামলার বিষয়টি স্বীকার করলেও একে ‘বড় কোনো হুমকি নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারের এমন উদাসীনতায় ক্ষুব্ধ। আলিনা ওরলোভা নামে এক বাসিন্দা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমরা ধোঁয়া আর আতঙ্কে বাস করছি, অথচ বলা হচ্ছে সব ঠিক আছে। প্রেসিডেন্ট কেন নিজে এসে পরিস্থিতি দেখে যান না?’
রুশ কর্তৃপক্ষ এই বিপর্যয়ের তথ্য গোপন করতে ইন্টারনেট ও টেলিগ্রাম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ইউক্রেন চলতি বছরের শুরু থেকে রাশিয়ার বিভিন্ন তেল অবকাঠামোতে ২০ বারের বেশি হামলা চালিয়েছে।
কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিকসের তথ্যমতে, মার্চ ও এপ্রিলের শুরুতে প্রধান টার্মিনালগুলোতে হামলার কারণে রাশিয়ার প্রায় ২২০ কোটি ডলার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। তুয়াপসে শোধনাগারটি পুনরায় নির্মাণ করতে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার খরচ হতে পারে।
ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞরা একে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বদলে ইউক্রেনের ‘কাইনেটিক স্যাংশন’ বা সামরিক নিষেধাজ্ঞা হিসেবে অভিহিত করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের ড্রোনগুলো এখন রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছে। এমনকি মস্কোর ক্রেমলিনের মাত্র সাড়ে তিন মাইল দূরে একটি আবাসিক ভবনেও ড্রোন আঘাত হেনেছে। বর্তমানে তুয়াপসেতে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বাসিন্দাদের কলের পানি পান না করতে ও জানালা বন্ধ রেখে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম থাকলেও, ইউক্রেনের হামলার কারণে রাশিয়া এপ্রিল মাসে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। তেল শোধনাগার ও পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়ার অর্থনীতি ও বাজেটে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
এএম