ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটিতে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সাহিল খান নামে ২০ বছর বয়সী এক মুসলিম শিক্ষার্থীকে আটক, মারধর ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। গত ১৩ অক্টোবর এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ভারতের সংবাদমাধ্যম মাকতুব মিডিয়া।
সাহিল খান ভারতের স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) কর্মী এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তার অভিযোগ, প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে পুলিশ তাকে আটক করে পানবাজার থানায় নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশ সদস্যরা তাকে ইসলামবিদ্বেষী গালাগাল করেন এবং মুসলিম হয়েও কেন প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সাহিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন উইমেন এগেইনস্ট ভায়োলেন্স কালেকটিভের আয়োজনে ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’ অনুষ্ঠিত হয়। গুয়াহাটির নেহরু পার্কের কাছে আয়োজিত এ কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পর এক বন্ধুকে নিয়ে স্কুটারে ফেরার সময় পুলিশ তাদের পথ আটকায়। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে পুলিশ প্রথমে স্কুটারের কাগজপত্র দেখতে চায়। কাগজপত্র ঠিক থাকার কথা জানানোর পরও পুলিশ তাঁকে গাড়িতে উঠতে বলে।
কেন তাকে নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে চাইলে পুলিশ কোনো কারণ জানায়নি বলে অভিযোগ সাহিলের। তিনি যেতে অস্বীকৃতি জানালে এক পুলিশ সদস্য ও গাড়িচালক তাকে চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলেন। তিনি বলেন, গাড়ির ভেতরে তারা আমার চুল ধরে আমাকে মারধর করে। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কেন বিক্ষোভে অংশ নিয়েছি, কারণ আমি একজন মুসলিম। পুলিশ আমাকে নির্মমভাবে পিটিয়েছে
২০ বছর বয়সী এই তরুণী বলেন, পুলিশ বারবার আমাকে ‘মিয়া’ বলে সম্বোধন করছিল। তাদের একজন আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বলে, ‘তোকে গায়েব করে দেব’, আর অন্যজন বলে, ‘আমরা তোকে মেরে ফেলব’।
সাহিল প্রশ্ন তোলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় ন্যায়বিচার চাওয়া কি অপরাধ? নাকি মুসলিম হওয়াটাই অপরাধ? তার দাবি, প্রতিবাদে দুই শতাধিক মানুষ অংশ নিলেও পুলিশ শুধু তাকেই লক্ষ্যবস্তু করেছে।
থানায় আটকের কথা প্রথমে অস্বীকার পুলিশের
সাহিলের আটকের খবর পেয়ে তার বন্ধু ও সহকর্মীরা তাকে খুঁজতে একাধিক থানায় যান। তাদের অভিযোগ, প্রথমে পুলিশ বিভিন্ন থানায় সাহিলকে আটকের কথা অস্বীকার করে। পরে তারা স্বীকার করেন যে তিনি ভেতরেই আছেন এবং তাকে পেছনের দরজা দিয়ে আনা হয়েছে।
এই বিক্ষোভ কর্মসূচির অন্যতম আয়োজক এবং এসএফআই-এর রাজ্য যুগ্ম সম্পাদক উৎপলা দাস জানান, খানকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে তা খুঁজে বের করার আগে বিক্ষোভকারীরা বেশ কয়েকটি থানায় খোঁজ নিয়েছিলেন। “সাহিলকে আটক করার খবর পাওয়ার পর আমরা বেশ কয়েকটি থানায় খোঁজ নিই, কিন্তু তারা তাকে আটকে রাখার কথা অস্বীকার করে। আমরা চাপ প্রয়োগ করি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হই; এরপর জানতে পারি যে তাকে পানবাজার থানায় আটকে রাখা হয়েছে।”
উৎপলা দাসের অভিযোগ, সাহিলকে চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া, মারধর এবং সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করার বিষয়টি বিক্ষোভকারীরা তার কাছ থেকেই জানতে পারেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে মুসলিম পরিচয়ের কারণে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে তা অস্বীকার করেন। পরে সাহিলের নামের সঙ্গে ‘মিয়া’ শব্দ যুক্ত থাকার কারণে তাঁকে এভাবে সম্বোধন করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেন বলে জানান উৎপলা। তবে এ ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সাহিলের নাম সাহিল খান।
সাহিলকে চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উৎপলা। তার অভিযোগ, পুলিশ তাকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ পথ ঘুরে যায় এবং পরে থানায় ফিরিয়ে আনে। এর পেছনে পুলিশের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উৎপলা জানান, এ ঘটনায় তারা আইনি পদক্ষেপ নেবেন। তার মতে, বিষয়টি শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নয়; মুসলিমদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।
সাহিলের ও বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাকে আটক করা হয়। পরে চিকিৎসা পরীক্ষা শেষে রাত ৯টার দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদে ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’
১৩ অক্টোবর নেহরু পার্কের কাছে ‘উইমেন এগেইনস্ট ভায়োলেন্স কালেক্টিভ’ (নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদে গঠিত জোট) একটি ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’-এর আয়োজন করে। এতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের দাবি জানানো হয় এবং লিঙ্গ সমতার আহ্বান জানানো হয়। এই কর্মসূচির কয়েক ঘণ্টা পরই খানকে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
আয়োজকদের দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকার কথা জানিয়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মিছিলটি এগিয়ে যেতে বাধা দেন। পরে আয়োজকেরা মিছিল না করে ঘটনাস্থলেই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।
আয়োজকরা জানান, ১৫ দিনের ব্যবধানে যৌন সহিংসতার কারণে দুজন তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। এটি নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা এবং চরিত্র হননের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
আয়োজক সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, যেখানে আসামের এক নারীকে রেললাইনের পাশে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর আগে ওই নারী ট্রেনে মদ্যপ পুরুষদের আচরণের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। রেলওয়ে পুলিশের ধারণা, চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে হয়তো তার মৃত্যু হয়েছে; অন্যদিকে পরিবারের অভিযোগ, তাকে হত্যা করা হয়েছে।
ওই আয়োজক বলেন, শহরে নারীর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অপরাধের মোকাবিলায় এটি ছিল একটি সম্মিলিত আহ্বান।
সংহতি প্রকাশের আহ্বানে আয়োজকরা গুয়াহাটির নারীদের প্রতি আহ্বান জানান—যারা প্রাণ হারিয়েছেন, যারা বেঁচে থেকেও মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন এবং যারা ভয় বা লজ্জা ছাড়া বাঁচতে চাইছেন—সেই সব নারীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
পদযাত্রার পর খানকে আটক করার অভিযোগের বিষয়ে ওই আয়োজক বলেন, এটি মুসলমানদের প্রতি পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গিকেই স্পষ্ট করে তোলে; এটি পুলিশের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ধর্মীয় বৈষম্য।
প্রতিবাদ কর্মসূচির পর সাহিলকে আটকের অভিযোগ প্রসঙ্গে আয়োজকদের একজন বলেন, এ ঘটনা মুসলিমদের প্রতি পুলিশের মনোভাব তুলে ধরে। তার অভিযোগ, এটি পুলিশের ধর্মীয় বৈষম্যেরই প্রকাশ।
এমএমআর