ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপে নজিরবিহীন বোর্ডরুম সংকট দেখা দিয়েছে। ১৫৮ বছরের পুরোনো এই শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণকারী দাতব্য সংস্থা টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে গ্রুপের হোল্ডিং কোম্পানি টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদের বিরোধ এখন প্রকাশ্যে এসেছে। এর ফলে টাটা গ্রুপের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার ও এয়ার ইন্ডিয়ার মালিক টাটা গ্রুপের বার্ষিক আয় ১৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সাম্প্রতিক কয়েক মাস ধরে টাটা সন্স ও টাটা ট্রাস্টসের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে মতবিরোধ চলছিল। এর মধ্যে রয়েছে টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা, এয়ার ইন্ডিয়ার ক্রমবর্ধমান লোকসান এবং এক সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারের অংশীদারত্ব থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা।
বৃহস্পতিবার টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদ নটরাজন চন্দ্রশেখরনের চেয়ারম্যান হিসেবে মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানান টাটা ট্রাস্টসের প্রধান নোয়েল টাটা। পরে টাটা ট্রাস্টস প্রকাশ্যে এই পুনর্নিয়োগের বিরোধিতা করে। তাদের দাবি, অভ্যন্তরীণ নিয়ম লঙ্ঘন করে চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনারও বিরোধিতা করেছে টাটা ট্রাস্টস। তাদের ভাষ্য, এমন পদক্ষেপ নিলে দাতব্য সংস্থার সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন টাটা গ্রুপের বর্তমান বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যাবে।
টাটা ট্রাস্টসের হাতে কতটা নিয়ন্ত্রণ
টাটা ট্রাস্টসের হাতে টাটা সন্সের ৬৬ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। এই ট্রাস্টের নেতৃত্বে আছেন নোয়েল টাটা, যিনি টাটা পরিবারের সদস্য। টাটা গ্রুপের বিভিন্ন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া লভ্যাংশ ট্রাস্টের মাধ্যমে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা হয়।
টাটা পরিবার পারসি সম্প্রদায়ের সদস্য। তারা জরথুস্ত্রবাদী জনগোষ্ঠীর বংশধর, যারা পারস্য থেকে পালিয়ে এসে প্রায় অষ্টম শতক থেকে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে বলে ধারণা করা হয়।
অন্যদিকে, চন্দ্রশেখরন টাটা পরিবারের সদস্য নন। তিনি ১৯৮৭ সালে টাটা গ্রুপে যোগ দেন।
টাটা ট্রাস্টসের ৬৬ শতাংশ মালিকানা থাকায় সাধারণ পরিস্থিতিতে টাটা সন্সের অধিকাংশ সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ বিরোধ সেই ক্ষমতা প্রয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টাটা ট্রাস্টস মূলত একাধিক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত। এর অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান স্যার রতন টাটা ট্রাস্টের একাই টাটা সন্সে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। ট্রাস্টিদের নিয়োগ নিয়ে বিরোধের কারণে একটি দাতব্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওই ট্রাস্টকে ট্রাস্টিদের সভা আহ্বান করতে নিষেধ করেছে। ফলে আপাতত তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগ ঘিরে বিরোধ
টাটা ট্রাস্টসের বক্তব্য, টাটা সন্সের চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং কোম্পানিটিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ট্রাস্টের দুই মনোনীত পরিচালক—নোয়েল টাটা ও ভেনু শ্রীনিবাসনের—সম্মতি প্রয়োজন।
চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগে নোয়েল টাটা আপত্তি জানালেও ভেনু শ্রীনিবাসন এতে সম্মতি দিয়েছেন। ফলে টাটা ট্রাস্টসের মনোনীত দুই পরিচালকের মধ্যেই মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
নোয়েল টাটার অবস্থান হলো, দুই ট্রাস্টি মনোনীত পরিচালকের ভোট এক না হওয়ায় চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগ বৈধ হয়নি। তবে টাটা সন্সের বক্তব্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এতে কোনো অনিয়ম হয়নি।
তালিকাভুক্তি নিয়ে এত বিরোধ কেন
টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া টাটা সন্সকে এমন একটি নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে, যার আওতায় কোম্পানিটিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হতে পারে।
বৃহস্পতিবারের বোর্ড সভায় টাটা সন্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু নোয়েল টাটা এর বিরোধিতা করেন।
পরে এক বিবৃতিতে টাটা ট্রাস্টস জানায়, হোল্ডিং কোম্পানির উচিত তালিকাভুক্তির বিকল্প পথ খোঁজা। তাদের মতে, টাটা গ্রুপের কাঠামো অন্যদের তুলনায় আলাদা, কারণ এর সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার একটি দাতব্য সংস্থার হাতে। তাই টাটা সন্সকে তালিকাভুক্ত করা হলে এই কাঠামোর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, টাটা সন্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার শাপুরজি পালোনজি গ্রুপ কোম্পানিটিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সম্ভাবনাকে সমর্থন করেছে। শাপুর মিস্ত্রির নেতৃত্বাধীন এই গ্রুপের সঙ্গে নোয়েল টাটার পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে; শাপুর মিস্ত্রির বোন নোয়েল টাটার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ।
বিশ্বজুড়ে টাটার বিশাল ব্যবসা
১৮৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত টাটা গ্রুপ বর্তমানে ছয়টি মহাদেশের ১০০টিরও বেশি দেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। টাটা সন্সের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ৩০টির বেশি কোম্পানি। এর মধ্যে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, টাটা মোটরস এবং বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টাটা স্টিল।
অ্যাপল ও টেসলার মতো বিশ্বের বড় প্রযুক্তি ও গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টাটা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক। আবার স্টারবাকসের সঙ্গে টাটার অংশীদারত্ব রয়েছে।
টাটা গ্রুপের কোম্পানিগুলো সর্বশেষ অর্থবছরে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। টাটার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত গ্রুপের ২৬টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২৭৭ বিলিয়ন ডলার। তবে এসব কোম্পানির প্রত্যেকটির নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
সামনে কী হতে পারে
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, টাটা ট্রাস্টস চাইলে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডারের আপত্তি সত্ত্বেও টাটা সন্সকে তালিকাভুক্তির বিষয়টি বিবেচনার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
এ ছাড়া আগামী ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য টাটা সন্সের বার্ষিক সাধারণ সভাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেখানে টাটা ট্রাস্টস চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগ ঠেকানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে তার আগে ট্রাস্টের নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের সমাধান করা প্রয়োজন।
ফলে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত শিল্পগোষ্ঠী টাটায় এখন মূল প্রশ্ন শুধু চেয়ারম্যান পদে কে থাকবেন বা কোম্পানি শেয়ারবাজারে যাবে কি না—তা নয়; বরং দাতব্য মালিকানা, করপোরেট পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে, সেটিই বড় হয়ে উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স
এআরবি