সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য এই চুক্তির মূল্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে চুক্তিটি কার্যকর করতে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে।
এফ-৩৫ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। সৌদির কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রির সিদ্ধান্ত ঘিরে ইসরাইলের উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের অংশীদারত্বের কারণে এফ-৩৫-এর প্রযুক্তি বেইজিংয়ের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও ওয়াশিংটনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, প্রস্তাবিত এই বিক্রি উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির শক্তি হিসেবে কাজ করা ন্যাটোর বাইরের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরবের নিরাপত্তা জোরদার করবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্যও এগিয়ে যাবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য, এফ-৩৫ বিক্রি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে কোনো পরিবর্তন হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই নীতিতে বলা হয়, সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের তুলনায় ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা এগিয়ে থাকতে হবে।
এমন সময় এ ঘোষণা এল, যখন ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের লড়াই তীব্র হয়েছে। গত বুধবার হুথিরা দাবি করে, তারা মারিবের আকাশে একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে মারিব গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর।
হুথিরা এ ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে শহরটিতে তাদের যোদ্ধাদের একটি জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সেটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সৌদি চিহ্নযুক্ত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ বলে মনে হয়েছে।
হুথিদের দাবি, ‘স্থানীয়ভাবে তৈরি’ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে। দাবিটি সত্য হলে, ইয়েমেনে যুদ্ধ পরিচালনায় হুথিদের সক্ষমতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলবে। এত দিন ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী তুলনামূলকভাবে আকাশপথে আধিপত্য ধরে রেখেছে। প্রতিবেশী দেশটিতে বিমান হামলার সক্ষমতার ওপরও তারা ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছে।
এদিকে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ায় বৃহস্পতিবার অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে বলে জানা গেছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সংঘাতে ওয়াশিংটনকে আরো সরাসরি ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত হুথি, সৌদি আরব ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার এই সংঘাতে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না।
চীনের দিকেও নজর
এফ-৩৫ বিক্রির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চীনা গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়েও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ সপ্তাহে জানিয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের অংশীদারত্বের মাধ্যমে বেইজিং এফ-৩৫-এর প্রযুক্তি পেয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা।
এ কারণে চুক্তিটির বিরোধিতা করেছেন মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি রাজা কৃষ্ণমূর্তি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই সদস্য প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দা কমিটিতে রয়েছেন।
এক বিবৃতিতে কৃষ্ণমূর্তি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন সতর্ক করছে যে এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নাগালের মধ্যে চলে যেতে পারে, তখন চুক্তিটি এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
এর আগে গত মাসে সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত ওই চুক্তি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, দেশগুলো ওয়াশিংটনের ওপর কম নির্ভর করে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ খুঁজছে।
সৌদি আরব অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই এফ-৩৫ কেনার চেষ্টা করে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে একমাত্র এফ-৩৫ পরিচালনাকারী দেশ ইসরাইল। রিয়াদের কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রি নিয়ে দেশটির কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্যও চাপ রয়েছে।
এদিকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান তৈরির বহুদেশীয় উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ন্যাটোর সদস্য তুরস্ককে ২০১৯ সাল থেকে এসব যুদ্ধবিমান দেওয়া বন্ধ রয়েছে। ওই বছর রাশিয়ার কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর তুরস্কের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত এই বিক্রির প্যাকেজে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ৪৯টি প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি এফ১৩৫ ইঞ্জিন, যোগাযোগ ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, সিমুলেটর, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তাও রয়েছে।
এএম