বিবিসির বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে গত মাসে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি এখনো নাজুক হলেও ইরানে নেতৃত্বের পরিবর্তন, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের সম্ভাব্য নতুন অধ্যায় নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের সূচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের অবসান ঘটে। তার স্থলাভিষিক্ত হন ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি। একই সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের নেতারা, যাদের অধিকাংশই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ভ্যালি নাসরের ভাষায়, এ ধরনের বড় যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত পুরো দাবার ছকই বদলে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যেও সেটাই ঘটছে।
যুদ্ধে টিকে থেকে পাল্টে গেছে ইরানের অবস্থান
যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা ছিল, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্বল অর্থনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সিরিয়া, লেবানন, গাজা ও ইয়েমেনে মিত্রদের দুর্বল হয়ে পড়ায় ইরান ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
তবে বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র দেখায়। হরমুজ প্রণালী বন্ধের সক্ষমতা, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা এবং সামরিক প্রতিরোধের মাধ্যমে ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বিশ্লেষক আলী ভায়েজের মতে, উপসাগরীয় অনেক দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবছে এবং একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগও নিচ্ছে।
নতুন নেতৃত্ব, নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতৃত্ব আদর্শিক স্লোগানের চেয়ে রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সাবেক নেতা আলী খামেনির দীর্ঘদিনের ‘যুদ্ধ নয়, শান্তিও নয়’ নীতির পরিবর্তে বর্তমান নেতৃত্ব একদিকে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায়ও বসেছে।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ সানাম ভাকিল বলেন, ৮৬ বছর বয়সী নেতৃত্বের যুগ শেষ হয়েছে। নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও বাস্তববাদী এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
অভ্যন্তরীণ নীতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
যদিও নতুন নেতৃত্ব এখনো ভিন্নমত দমনে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে, তবুও সামাজিক ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে বাধ্যতামূলক হিজাব প্রয়োগ অনেকটাই শিথিল হয়েছে এবং তেহরানের কিছু রেস্তোরাঁয় নীরবে মদ্যপানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন বাড়ানো।
কূটনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
যুদ্ধবিরতি স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে। এর ফলে ইরান ৬০ দিনের জন্য অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে। আলোচনায় অগ্রগতি হলে ইরানের স্থগিত সম্পদ মুক্ত করা এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহারের সম্ভাবনাও রয়েছে।
চুক্তিতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এর অর্থায়ন কীভাবে হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের জন্য যেমন একটি বড় সুযোগ, তেমনি বড় ঝুঁকিও। পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, লেবাননের পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক অবিশ্বাস সবকিছুই ভবিষ্যৎ আলোচনার সাফল্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিল সতর্ক করে বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি না হলে পরিস্থিতি আবারও সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পুরোনো নেতৃত্বের অবসানের পর নতুন বাস্তববাদী নেতৃত্ব দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে। তবে এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবারো নতুন সংঘাতের দিকে এগোবে তার উত্তর সময়ই দেবে।
সূত্র: বিবিসি
এআরবি