ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন নতুন সংকটে পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ এবং শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কায় এসব দেশে দারিদ্র্য আরও বাড়তে পারে। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রধান আলেকজান্ডার ডি ক্রু সতর্ক করে বলেছেন, একের পর এক সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেক দেশের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থ ও সময়—কোনোটিই থাকছে না।
বৃহস্পতিবার ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকের ফাঁকে বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডি ক্রু বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আগের সংকটের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সুরক্ষা গড়ে তোলার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি বোঝাতে তিনি বলেন, একই সময়ে ঘরের ছাদ মেরামত করতে হচ্ছে, আবার ঘরেও আগুন জ্বলছে। কিছু দেশের ব্যাংকে অর্থ আছে এবং তাদের অর্থনীতি সংকট মোকাবিলার মতো সুরক্ষিত। কিন্তু অনেক দেশের সেই সামর্থ্য নেই। এসব দেশের প্রয়োজন সংকট সামাল দেওয়ার জন্য আর্থিক অবকাশ, সময় ও অর্থায়নের সুযোগ।
দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ১৩ কোটি মানুষ
ইউএনডিপির এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ ভোক্তাদের ওপর পড়লে চলতি বছর বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলো এ ঝুঁকিতে বিশেষভাবে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়েছে। তেহরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের মিত্রদের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে বড় ধরনের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
জ্বালানির বাড়তি দাম থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে অনেক উন্নয়নশীল দেশের সরকার ভর্তুকি ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু একের পর এক সংকটে সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের সহায়তা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর থেকে বিভিন্ন দেশে বাজেট ঘাটতি ও জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত বেড়েছে। এর সঙ্গে করোনাভাইরাস মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো সংকট যুক্ত হয়ে সরকারগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকে আরো চাপে ফেলেছে।
এদিকে আইএমএফ সতর্ক করেছে, জ্বালানি সংকটের মধ্যেও বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এখন পর্যন্ত টিকে থাকলেও তা অনেকাংশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের উত্থানের ওপর নির্ভরশীল। এ ধরনের বিনিয়োগের সুবিধা না পাওয়া দরিদ্র দেশগুলো এখনো অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে লড়ছে।
আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও সামনে কঠিন সময় আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। তার বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, সম্ভাব্য বড় সংকট মোকাবিলায় বিশ্বকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
ঋণের সুদে চলে যাচ্ছে সরকারি আয়ের বড় অংশ
উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট আরও বাড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক ঋণের উচ্চ ব্যয়। উন্নত দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা, ঋণের অনুপাত বৃদ্ধি এবং এআই খাতে পুঁজি সংগ্রহের কারণে বন্ডের সুদ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক ঋণবাজারে, ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ইউএনডিপির তথ্য অনুযায়ী, একটি মধ্যম পর্যায়ের উন্নয়নশীল দেশ এখন সরকারি রাজস্বের প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় করছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ এবং উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো খাতে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
সাবেক বেলজীয় প্রধানমন্ত্রী ডি ক্রু বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকারগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তায় সাম্প্রতিক বড় ধরনের কাটছাঁট উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। ব্যাংককে অবস্থানকালে উন্নত দেশ ও বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোকে উন্নয়নশীল বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন তিনি।
এল নিনো বাড়াতে পারে সংকট
জ্বালানি ও ঋণের চাপের পাশাপাশি জলবায়ু পরিস্থিতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চলতি বছরের এল নিনো রেকর্ডে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাবে বন্যা, খরা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে, যার প্রভাব ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এতে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি এবং সরকারি সহায়তা দেওয়ার সামর্থ্য সীমিত, সেসব দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ডি ক্রু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও জরুরি। জলবায়ুজনিত ক্ষতির অর্থনৈতিক ব্যয় রয়েছে, আর সেই ক্ষতি এড়ানোর পেছনে বিনিয়োগেরও সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক যুক্তি আছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং জলবায়ু সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। ইউএনডিপির মতে, সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়ানো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের বোঝা সামলানোর সুযোগ তৈরি করা এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া জরুরি। তা না হলে চলতি বছরই বিশ্বে আরও কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সূত্র: এএফপি ও ডন