কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু সেনাবাহিনী, অস্ত্র বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সংহতি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অস্ত্র সীমান্ত রক্ষা করতে পারে, কিন্তু একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখে তার সামগ্রিক স্থিতিস্থাপকতা।
জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা বলতে সংকট বা বড় ধরনের আঘাত এলে তা সামলে নেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রাধিকার পরিবর্তন করা এবং সংকটের আগেই মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক প্রয়োজনগুলো সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতাকে বোঝায়।
একটি দেশের হাতে সেনাবাহিনী, অর্থ, তেল, ভৌগোলিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক জোট থাকতে পারে। কিন্তু এসব সম্পদ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সংকটের সময় কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে এবং দেশের প্রতিষ্ঠান ও জনগণ কতটা প্রস্তুত—সেটিই প্রকৃত শক্তির পরীক্ষা।
আধুনিক জাতীয় নিরাপত্তা এখন শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক সচেতনতা, সংকট ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে বাইরের শক্তির সুযোগে পরিণত হতে না দেওয়াও জড়িত।
কয়েক দশকে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য, পানি ও জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। একই সঙ্গে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও মৌলিক শিল্প দুর্বল হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত উৎপাদনের পরিবর্তে সম্পদনির্ভর ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে বড় ধরনের সংকটে এসব রাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
জাতীয় স্থিতিস্থাপকতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, যারা সংকটের মধ্যেও সিদ্ধান্ত নিতে ও তা বাস্তবায়ন করতে পারে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দক্ষ প্রতিষ্ঠান, সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা এবং দেশের অভ্যন্তরকে সংঘাত বা প্রক্সি লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে না দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার জন্য আয় ও অর্থনীতির বৈচিত্র্য, পর্যাপ্ত মজুত এবং এমন সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন, যা সামান্য আঞ্চলিক অস্থিরতায় ভেঙে পড়বে না। অন্যদিকে সামাজিক স্থিতিস্থাপকতার জন্য সামাজিক সংহতি, মানুষের মধ্যে আস্থা এবং দায়িত্বশীল সমালোচনার পরিবেশ প্রয়োজন।
খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও তথ্যকেও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে শুষ্ক ও অস্থিতিশীল অঞ্চলে এসব সম্পদের নিরাপত্তা কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। কোনো দেশ তার জনগণের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও তথ্যের ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারলে তার সার্বভৌম সক্ষমতাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
সৌদি আরবের স্থিতিশীলতার পেছনে সামরিক শক্তির পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, নমনীয়তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং উত্তেজনা কমানোর নীতিও ভূমিকা রেখেছে। শক্তি ধরে রাখার পাশাপাশি কখন সংঘাত এড়িয়ে চলতে হবে, সেটিও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরব বিশ্বের হাতে বিপুল প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ রয়েছে। তেল ও গ্যাসের বড় মজুতের পাশাপাশি এই অঞ্চলের জনসংখ্যা ৫০ কোটির বেশি। এসব সম্পদকে খাদ্য, পানি, জ্বালানি, শিল্প, বিজ্ঞান ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তা দীর্ঘমেয়াদি শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
শুধু অস্ত্রের মজুত বাড়িয়ে কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, সমাজ, খাদ্য ও পানি ব্যবস্থা এবং জনগণের সক্ষমতাকে শক্তিশালী করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শান্তির সময়ে যে স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলা হয় না, সংকটের সময় তা হঠাৎ তৈরি করা সম্ভব নয়।