ইসরাইলের নির্বাচনে আজ মঙ্গলবার ভাগ্যপরীক্ষায় নামছেন দেশটির দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজায় যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা—সব মিলিয়ে চাপে রয়েছেন তিনি। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির শক্ত অবস্থান এবং দেশটির জটিল নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে আবারও ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ রয়েছে তার।
জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার ডানপন্থি মিত্রদের সঙ্গে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আইজেনকট ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান। নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত এই নেতার সমর্থকদের মধ্যে ডান ও মধ্যপন্থি—দুই ধারার ভোটারই রয়েছেন।
নেতানিয়াহু তার নির্বাচনী প্রচারে যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নিয়েছে। গত রোববার নেতানিয়াহু বলেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলেই ইরানের হুমকি চূড়ান্তভাবে দূর করতে ট্রাম্প আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
তবে আইজেনকট নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভয় ছড়ানো, মিথ্যা বলা ও হুমকির রাজনীতির অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, জনগণ যাকে নেতা হিসেবে বেছে নেবে, ট্রাম্প তার সঙ্গেই পূর্ণ সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করবেন।
নেতানিয়াহুকে আবারও সরকার গঠনের জন্য কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন গভির ও বেজালেল স্মোতরিচের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে পশ্চিমা কয়েকটি দেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে জনমত জরিপে বেন গভিরের দল জিউইশ পাওয়ারের সমর্থন বেড়েছে।
নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট—কেউই সরকার গঠনের বিষয়ে নিশ্চিত অবস্থানে নেই। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট গঠন করতে না পারলে আগামী বছর নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ক্ষমতায় থাকতে পারেন নেতানিয়াহু। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটির মধ্যে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলা, এরপর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং নেতানিয়াহুর ডানপন্থি সরকারের নীতি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে গভীর বিভাজন—সবকিছুই নির্বাচনের আলোচনায় প্রভাব ফেলছে।
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের কাছে নির্বাচনের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন হলো, ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় কে নেবে। ওই দিনটি ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন।
আইজেনকটের সমর্থক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মী মালি হাজাজ বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন। কারণ, সেখান থেকেই আমাদের ক্ষত নিরাময় শুরু হবে।’
লিসা টরটরও নেতানিয়াহুর বিদায় চান। তার আশা, নেতানিয়াহু ক্ষমতা ছাড়লে নতুন সরকার গঠন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ইহুদি জনগোষ্ঠী, ইসরাইল এবং বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া যাবে। নেতানিয়াহুকে তার ডাকনাম ‘বিবি’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে ১৮ বছর বয়সি লিকুদ-সমর্থক নোফ গাবাই মনে করেন, ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করা ঠিক নয়।
তার ভাষায়, ‘ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য নেতানিয়াহুই সঠিক ব্যক্তি।’
গাবাই আরো বলেন, ‘নেতানিয়াহু যুদ্ধ সবচেয়ে ভালোভাবে পরিচালনা করেছেন।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। হামলাকারীরা ২৫১ জনকে পণবন্দি করে নিয়ে যায়। এর জবাবে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরাইল। ওই অভিযানে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরাইলি হামলায় সেখানে ৭৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
গাজার পাশাপাশি লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপরও বড় ধরনের আঘাত হেনেছে ইসরাইল। ইরানের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলার পর ২০২৫ সালে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ১২ দিনের বিমান অভিযান চালায় ইসরাইল। চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে যুদ্ধে অংশ নেয়।
আইজেনকট বলেছেন, ইসরাইলের পরবর্তী সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, ইরান যেন সামরিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের কথা বলেছেন তিনি।
ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কয়েক দশক ধরে চলা শান্তি আলোচনার ভিত্তি ছিল দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান। তবে ইসরাইলের প্রায় সব ইহুদি-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলের মতো আইজেনকটও এই সমাধানের বিরোধী।
তা সত্ত্বেও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের পর থেকে এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহুর জোটসঙ্গী বেন গভির ও স্মোতরিচের বিরোধিতাও করছেন আইজেনকট।
লিকুদ পার্টির শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তুষ্ট ভোটারদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ ঘরে ঘরে গিয়ে অন্য ভোটারদের নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আহ্বান জানাচ্ছেন। দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়াও নেতানিয়াহুর প্রতি কিছু ভোটারের অসন্তোষ বাড়িয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
ইসরাইলের আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটের হারও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা ইসরাইলের নাগরিক হলেও তাদের জাতিগত পরিচয় ফিলিস্তিনি। তাদের বেশি সংখ্যায় ভোট দেওয়া আইজেনকটের পক্ষে সরকার গঠনের জটিল সমীকরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তার যুক্তি, এসব দলের সঙ্গে তার মূল্যবোধের মিল নেই।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আরব দলগুলো আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে।
ইসরাইলের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল বলেন, ‘আমার ধারণা, দুই পক্ষের যেকোনো একটি খুব সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে। বড় ব্যবধানে কোনো পক্ষের জয়ের সম্ভাবনা নেই।’
এএম