হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ইসরাইলের নির্বাচনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

আলজাজিরা

ছবি: এপি

ইসরাইলে আগামীকাল মঙ্গলবার পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলা এবং এরপর গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন। ইসরাইলের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে এটিকে।

বহু বছর ধরে চলা একাধিক সংঘাতে জড়িয়ে আছে ইসরাইল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটি ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছে। দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন গভীর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এবারের নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে, আগামী দিনে ইসরাইলের সরকার কোন পথে এগোবে।

নির্বাচন সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিষয় তুলে ধরা হলো।

১. প্রধান দলগুলো কারা, জনমত জরিপ কী বলছে

ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। কোনো দলকে পার্লামেন্টে আসন পেতে হলে নির্বাচনে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। পার্লামেন্টের মেয়াদ চার বছর।

এবারের নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য মূলত দুটি রাজনৈতিক জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। প্রথমটি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট। এর প্রধান দল লিকুদ পার্টি। এই জোটে রয়েছে কয়েকটি উগ্র ইহুদিপন্থি ও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি দল। এর মধ্যে আছে রক্ষণশীল ধর্মীয় দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাস। পাশাপাশি রয়েছে উগ্র ইহুদিপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের নেতৃত্বাধীন ওতজমা ইয়েহুদিত এবং বেজালেল স্মোতরিচের নেতৃত্বাধীন রিলিজিয়াস জায়োনিজম-জেহুত।

প্রধান বিরোধী জোটে রয়েছে ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন চারটি রাজনৈতিক দল ও জোট। এগুলো হলো সাবেক ইসরাইলি সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি, সাবেক উপসেনাপ্রধান ইয়াইর গোলানের নেতৃত্বাধীন দ্য ডেমোক্র্যাটস, সাবেক অর্থমন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যানের নেতৃত্বাধীন ইসরাইল বেইতেনু পার্টি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন টুগেদার জোট। এ জোটে নেসেটের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদও রয়েছেন।

নতুন জনমত জরিপ প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে গত শুক্রবার প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপগুলোতে দেখা গেছে, কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়ার পথে নেই।

ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান-এর এক জরিপে বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নেতানিয়াহুর জোট পেতে পারে ৫০টি আসন। বাকি আসনগুলো পেতে পারে অন্য দলগুলো। এর মধ্যে রয়েছে আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের সমর্থনপুষ্ট দুটি প্রধান রাজনৈতিক তালিকা—রা’আম বা ইউনাইটেড আরব লিস্ট এবং জয়েন্ট লিস্ট। জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হাদাশ, বালাদ ও তাআল দল।

তবে নেতানিয়াহুপন্থি ও নেতানিয়াহুবিরোধী—দুই জোটই আপাতত আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে।

এতে নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে জটিল দর-কষাকষির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোনো জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে অন্য দলের সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা হতে পারে। সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে ইসরাইলে আবার নির্বাচন হতে পারে।

২. নির্বাচনে প্রধান ইস্যু কী কী?

এবারের নির্বাচনে ইসরাইলিদের সামনে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা সংকট বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।

দেশের ভেতরে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি বাড়ছে। একই সঙ্গে কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য নেতানিয়াহুর বারবার নেওয়া উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ আছে।

সমালোচকদের মতে, এসব উদ্যোগ ইসরাইলের উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ও ইসরাইলি-আমেরিকান ভাষ্যকার মেইরাভ জনসজেইন আলজাজিরাকে বলেন, ইসরাইলের ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থি বিরোধী দলগুলো মনে করছে, গণতন্ত্র রক্ষা এবং নেতানিয়াহুর একের পর এক মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধারের এটাই শেষ সুযোগ।

দীর্ঘদিনের যুদ্ধেও ক্লান্ত ইসরাইলের জনগণ। একাধিক সামরিক সংঘাতের বিষয়ে দেশটির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত, তা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে আলোচনা চলছে। অনেকেই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চান। তবে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও লেবাননের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে তাদের অনেকেরই আপত্তি রয়েছে।

৩. এবারের নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন। এর মধ্যে ইসরাইলি সমাজে উগ্র-ইহুদিপন্থি মনোভাব বেড়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে বিভাজনও গভীর হয়েছে।

ইসরাইলের বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি আলজাজিরাকে বলেন, ইসরাইলি সমাজের একটি অংশে সহিংসতা ও উগ্র-ইহুদিপন্থি বক্তব্যের প্রবণতা আগে থেকেই ছিল। তবে বর্তমান সরকারের আমলে এসব প্রবণতা আরো দ্রুত বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরাইলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ বসতি স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেশটির কয়েকটি মিত্র দেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। গাজা ও লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত হামলারও নিন্দা জানিয়েছে অনেক দেশ।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহু ভাষণ দেওয়ার সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তাদের কেউ কেউ নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় বিদ্রূপ ও দুয়োধ্বনিও দেন।

এবারের নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করতে পারে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসরাইলের পরবর্তী সরকার বর্তমান নীতি বজায় রাখবে, নাকি সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে।

৪. নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে?

ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত ১৭ বছরের মধ্যে ১৫ বছরেরও বেশি সময় দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। সব মিলিয়ে তার প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ ১৯ বছর।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থার কথিত ব্যর্থতা নিয়ে দেশে ও বিদেশে তার ওপর চাপ বাড়ছে। ২০১৯ সাল থেকে দুর্নীতির অভিযোগেও তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন।

নির্বাচনে পরাজিত হলে দুর্নীতির মামলাগুলোতে তার ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে। এসব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তার কারাদণ্ডও হতে পারে।

নতুন সরকার গঠিত হলে ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলা নিয়ে সম্ভাব্য তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগও প্রভাবিত হতে পারে। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর চাপ তৈরি করছে।

৫. ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য ইসরাইলি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকও রয়েছেন।

অন্যদিকে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ তাদের সীমান্ত, চলাচল ও আইনি অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইল সরকার।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোট দেওয়ার হার ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশ ভোট আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর পক্ষে যেতে পারে। এসব দলই মূলত ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে।

ভোট দেওয়ার হার ৬৫ শতাংশে পৌঁছালে আরব দলগুলো নেসেটে ১৫টি পর্যন্ত আসন পেতে পারে। নির্বাচনী প্রচারকেরা ভোট দেওয়ার হার ৭০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। তা হলে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি দেখা যেতে পারে। এতে ছোট দলগুলোর জন্য পার্লামেন্টে আসন পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

গত মাসে ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। ফলে আরব দল দুটি নির্বাচনে থাকার সুযোগ পায়। তবে ৭ অক্টোবরের হামলাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করে লেখা একটি নিবন্ধের কারণে বালাদ দলের নেতা সামি আবু শাহাদেহকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।

এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দুই প্রধান জোটই আপাতত তাদের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। কিন্তু আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া কোনো জোটের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হতে পারে।

নেতানিয়াহু বারবার বিরোধীদের বিরুদ্ধে আরব দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলানোর অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, বিরোধীরা সরকার গঠন করলে এসব দলের সমর্থন নিতে পারে। আর এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে একমাত্র তার লিকুদ পার্টিই সক্ষম।

ইসরাইলের নেসেট সদস্য আয়মান ওদেহের সাবেক সহযোগী জোসেফ মানসুরের মতে, আরব দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা নেতানিয়াহুর কৌশলের অংশ। এর ফলে কোনো জোট ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন।

আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির জন্য লেখা এক নিবন্ধে মানসুর বলেন, ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন যদি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বিরোধীরা ৬১টি আসন থেকে পিছিয়ে থাকে, তাহলে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থাই নেতানিয়াহুর জন্য আরেকটি রাজনৈতিক সাফল্যে পরিণত হতে পারে।

এএম

ইরান অভিযান নিয়ে ইসরাইলের সেনাপ্রধান ও নেতানিয়াহুর বিরোধ

হুথিরা যেভাবে সৌদি আরবের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠল

ইরানের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে মক্কা জোটের প্রতিনিধিরা

নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেভাবে মিয়ানমারে পৌঁছায় ইরানের জ্বালানি

সৌদির তেল স্থাপনায় ফের হামলা হুথিদের

রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে ফের হামলা হুথিদের

হুথিদের সুড়ঙ্গ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংসের দাবি সৌদি জোটের

মার্কিন সহায়তায় হরমুজ দিয়ে ১৫০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি উপসাগরীয় দেশগুলোর

নেতানিয়াহু বিদায় নিলেই কি শান্তি ফিরবে মধ্যপ্রাচ্যে

হুমকি দিয়ে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটলেন ট্রাম্প