যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ ও পানির বিপুল চাহিদা, পরিবেশের ওপর প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিষয়টি আগামী মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে বে এলাকার অন্তত সাতটি শহর ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
গত মাসে ওকল্যান্ড সিটি হলের সামনে ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের কয়েকজন কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি রোবটের পোশাক পরে ঢোলের তালে স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীদের মূল উদ্বেগ, বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য প্রক্রিয়াকরণের এসব কেন্দ্র স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এতে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলও অনেক বেড়ে যেতে পারে।
পরিবেশ ও ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কমিউনিটিজ ফর আ বেটার এনভায়রনমেন্টের কর্মী কার্লোস গুতিয়েরেজ বলেন, ‘ওকল্যান্ডে বিদ্যুতের দাম এতটাই বেড়েছে যে কেউ কেউ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা ভাবছেন। অথচ নগর কর্তৃপক্ষ একটি ডেটা সেন্টারকে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা করছে।’
যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে জনমত বাড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ইতোমধ্যে ৩ হাজারের বেশি ডেটা সেন্টার চালু রয়েছে। আরো ১ হাজার ৫০০টির বেশি নির্মাণের পরিকল্পনা বা কাজ চলছে।
তবে এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চলে অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই ও মেটার মতো বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিকাশ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে বলে মনে করা হয়।
এআইভিত্তিক ক্লড ও চ্যাটজিপিটির মতো সেবা চালাতে প্রয়োজনীয় উন্নত কম্পিউটার চিপ ও সার্ভার রাখা হয় ডেটা সেন্টারে। এসব কেন্দ্রকে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়। প্রসেসর ঠান্ডা রাখতেও বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়।
শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও ডেটা সেন্টার থেকে প্রচুর তাপ নির্গত হয়। এর ফলে আশপাশের ভূমির উপরিভাগের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু
ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের পরিবেশগত ও আর্থিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। ভোটের আগের শেষ দুই মাসে সান ফ্রান্সিসকো ও রিচমন্ডসহ বে এলাকার অন্তত সাতটি শহর ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভের পর ৬ অক্টোবর এ তালিকায় যুক্ত হয় ওকল্যান্ড।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়া স্থানীয় রাজনীতিকেরাও বিষয়টিকে ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করছেন।
বে এলাকার সবচেয়ে আলোচিত নির্বাচনগুলোর একটি হচ্ছে কংগ্রেসে ন্যান্সি পেলোসির ছেড়ে দেওয়া আসনটি। দীর্ঘ ৩৯ বছর প্রতিনিধি পরিষদে দায়িত্ব পালনের পর বছরের শেষ দিকে অবসরে যাচ্ছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির এই নেতা।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে তার আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুই ডেমোক্র্যাট—সান ফ্রান্সিসকোর সুপারভাইজার কনি চ্যান এবং অঙ্গরাজ্যের সিনেটর স্কট উইনার। এআই ডেটা সেন্টার নিয়ে তাদের অবস্থান ভিন্ন।
উইনার ডেটা সেন্টার নির্মাণে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিরোধী। ‘মিশন লোকাল’ নামের সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ডেটা সেন্টার নির্মাণে সার্বিক নিষেধাজ্ঞা এআই নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে দুর্বল করে দিতে পারে।
অন্যদিকে কনি চ্যান দায়িত্বশীল এআই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত দেশজুড়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অক্টোবরে এক বিতর্ক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘প্রথমে ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হোক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের কিছুটা সময় দেওয়া হোক।’
অক্টোবরের শুরুতে সান ফ্রান্সিসকোতে ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারির উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন চ্যান। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার এক জরিপে দেখা গেছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে উইনারের প্রতি সমর্থন ছিল ৪৭ শতাংশ। চ্যানের প্রতি সমর্থন ছিল ৪১ শতাংশ।
জনমতের বিরোধিতা, আপাতত নিষেধাজ্ঞা
সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুম প্রেস্টন বলেন, ‘এই মুহূর্তে ডেটা সেন্টারবিরোধী অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণকে অন্য যেকোনো ইস্যুর চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে।’
স্থানীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে শুনানিতে এখন পর্যন্ত তেমন বিরোধিতা দেখা যায়নি। এর পেছনে জনমতের বড় ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করেন প্রেস্টন। তার মতে, জরিপগুলোতে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে।
অক্টোবরে সিএনবিসির এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত ভোটারদের ৬৩ শতাংশ নিজেদের বাড়ির ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধী।
প্রেস্টন বলেন, ‘জরিপে ডেটা সেন্টারের প্রতি মানুষের সমর্থন খুবই কম। নির্বাচনের আগে নির্মাতারা সম্ভবত তাদের ঘনিষ্ঠ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিপাকে ফেলতে চান না। এ কারণেই হয়তো তারা নিষেধাজ্ঞাগুলো মেনে নিয়েছেন।’
নিষেধাজ্ঞার স্বল্পমেয়াদি মেয়াদও এর একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। সান ফ্রান্সিসকো, ব্রিসবেন ও ওকল্যান্ডের মতো কিছু শহরে ৪৫ দিনের জন্য ডেটা সেন্টার নির্মাণকাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। পরে এ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
প্রেস্টনের ধারণা, ৪৫ দিনের মেয়াদ শেষ হলে নিষেধাজ্ঞার বিরোধীরা আরো সোচ্চার হবেন। তত দিনে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও কমে আসবে। তিনি বলেন, ‘তখন শুনানিগুলো আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠবে।’
নিয়ন্ত্রণে তথ্যের ঘাটতি ও সময়ের সংকট
ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাব সাময়িক নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা। সান ফ্রান্সিসকোর সুপারভাইজার শামান ওয়ালটন শহরটিতে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করেছিলেন। তার মতে, ডেটা সেন্টার সম্পর্কে নগর কর্তৃপক্ষের সংজ্ঞা এখন পুরোনো হয়ে গেছে।
২০০১ সালে তৈরি সান ফ্রান্সিসকোর নগর পরিকল্পনা বিধিতে ডেটা সেন্টারকে ‘ইন্টারনেট সার্ভিস এক্সচেঞ্জ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তখন এআই প্রযুক্তির বর্তমান বিকাশ ঘটেনি। ফলে ওই সংজ্ঞা দিয়ে এখনকার ডেটা সেন্টারগুলোর প্রকৃত ধরন বোঝানো কঠিন।
ওয়ালটন বলেন, পুরোনো সংজ্ঞার কারণে শহরে আসলে কতটি ডেটা সেন্টার রয়েছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রগুলো শনাক্ত করতে না পারলে সেগুলোর বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহারও নজরদারির আওতায় আনা কঠিন।
১৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে ২০০১ সালের নিয়ম ব্যবহার করা যায় না।’
পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সময় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার জন্য যথেষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবাদী সংগঠন সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রজার লিন বলেন, ‘প্রভাব নথিবদ্ধ করা, তা পর্যালোচনা করা এবং এরপর বিধিমালা তৈরির জন্য ৪৫ দিন খুবই কম সময়।’
তিনি আরো বলেন, আইনি বাধার কারণে ডেটা সেন্টারগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া কঠিন।
লিনের ভাষায়, ‘ডেটা সেন্টারগুলোর সঙ্গে প্রায়ই গোপনীয়তা রক্ষার চুক্তি থাকে। ফলে স্থানীয় বায়ুমান পর্যবেক্ষণ বোর্ডও বায়ুর মানের ওপর এসব কেন্দ্রের প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারে না।’
অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে পাল্টা যুক্তি
এআই শিল্পের সমর্থকেরা বলছেন, ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ প্রযুক্তিশিল্পের বিকাশের প্রমাণ। এর ইতিবাচক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়তে পারে।
অ্যানথ্রপিক শেয়ারবাজারে প্রথমবারের মতো শেয়ার ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ উদ্যোগ থেকে প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকার সামগ্রিক অর্থনীতিতে সমানভাবে সুফল বয়ে আনবে না। বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধা মূলত ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এতে সাধারণ বাসিন্দারা বঞ্চিত হবেন।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি এবং দ্রুত বাড়তে থাকা বাড়িভাড়ার শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে সান ফ্রান্সিসকো।
শহরের সিটি হলে এক শুনানিতে এক বাসিন্দা ডেটা সেন্টার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই শহর মানুষের চেয়ে রোবট ও কোটিপতিদের জন্য বেশি হয়ে যাচ্ছে।’
এএম