একসময় চশমার কাজ ছিল শুধু চোখের দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখা বা সূর্যের আলো থেকে চোখকে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই সাধারণ চশমাই এখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে একটি পরিধানযোগ্য কম্পিউটারে। চোখে পরে ছবি তোলা, ফোন কল করা, গান শোনা, ভিডিও রেকর্ড করা, ভাষা অনুবাদ করা, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সঙ্গে কথা বলার সুবিধাও মিলছে আধুনিক স্মার্ট চশমায়। ফলে প্রযুক্তির বিশ্বে নতুন প্রশ্ন উঠেছেÑস্মার্টফোনের পরবর্তী ডিভাইস কি হতে যাচ্ছে স্মার্ট চশমা?
গত এক দশকে স্মার্টওয়াচ জনপ্রিয় হওয়ার পর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নজর এখন স্মার্ট চশমার দিকে। বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এমন ডিভাইস তৈরি করছে, যা দেখতে সাধারণ চশমার মতো হলেও ভেতরে রয়েছে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, স্পিকার, সেন্সর, ব্লুটুথ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কখনো কখনো অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) প্রযুক্তি। ফলে ব্যবহারকারী পকেট থেকে ফোন বের না করেই অনেক ডিজিটাল কাজ সম্পন্ন করতে পারেন।
স্মার্ট চশমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো হ্যান্ডস-ফ্রি কম্পিউটিং। ধরুন, আপনি হাঁটছেন বা গাড়ি মেরামত করছেন। তখন ফোন হাতে নেওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই চশমাকে বললেন, ‘আজকের আবহাওয়া বলো’, ‘মাকে ফোন করো’ বা ‘এই লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করো’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিতে পারে। কিছু উন্নত স্মার্ট চশমা ব্যবহারকারীর সামনে প্রয়োজনীয় তথ্যও প্রদর্শন করতে পারে। ফলে কাজের গতি ও সুবিধা দুটোই বাড়ে।
ভাষা অনুবাদের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কল্পনা করুন, আপনি এমন একটি দেশে ভ্রমণ করছেন, যেখানে স্থানীয় ভাষা বোঝেন না। স্মার্ট চশমা অন্য ব্যক্তি যা বলছেন, তা শুনে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে আপনার ভাষায় অনুবাদ করে দেখাতে বা শোনাতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্যও স্মার্ট চশমা হতে পারে এক নতুন হাতিয়ার। প্রথম-ব্যক্তির (First-person) দৃষ্টিকোণ থেকে ভিডিও ধারণ। লাইভ স্ট্রিমিং কিংবা ছবি তোলা অনেক সহজ হয়ে যায়। আলাদা ক্যামেরা হাতে না নিয়েও ব্যবহারকারী যা দেখছেন, তা-ই ধারণ করা সম্ভব। ফলে সাংবাদিকতা, ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও, খেলাধুলা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার বাড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোজন স্মার্ট চশমাকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে। আধুনিক কিছু ডিভাইস আশপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করে বস্তু শনাক্ত করতে পারে। লেখা পড়ে শোনাতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে দিতে পারে বা ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও এ ধরনের প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কারণ চশমাটি আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য জানাতে সক্ষম।
তবে স্মার্ট চশমা এখনো স্মার্টফোনের পূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। ছোট আকারের কারণে ব্যাটারির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বড় পর্দায় ভিডিও দেখা, দীর্ঘ সময় ধরে টাইপ করা বা জটিল অ্যাপ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে স্মার্টফোন এখনো অনেক বেশি সুবিধাজনক। এছাড়া উন্নত স্মার্ট চশমার দামও তুলনামূলক বেশি, যা সাধারণ ব্যবহারকারীর নাগালের বাইরে হতে পারে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। স্মার্ট চশমায় থাকা ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন অনেক সময় আশপাশের মানুষ বুঝতে না দিয়েই ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই উদ্বেগ কমাতে ক্যামেরা চালু থাকলে নির্দেশক আলো জ্বালানোসহ বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করছে।
বিশ্বের প্রযুক্তি বাজারে এখন স্মার্ট চশমা নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অগমেন্টেড রিয়েলিটি এবং দ্রুতগতির প্রসেসরের সমন্বয়ে আগামী কয়েক বছরে এই ডিভাইসগুলো আরো শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভবিষ্যতে স্মার্টফোনের অনেক কাজ স্মার্ট চশমা করতে পারবে। তবে স্মার্টফোন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে, এমন সম্ভাবনা এখনই নেই। বরং দুটি ডিভাইস একসঙ্গে কাজ করবে এবং ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নেবে।
অতএব বলা চলে, স্মার্ট চশমা শুধু একটি নতুন গ্যাজেট নয়। এটি পরবর্তী প্রজন্মের ব্যক্তিগত কম্পিউটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যেমন একসময় মোবাইল ফোন ধীরে ধীরে কম্পিউটারের অনেক কাজ নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল। তেমনি স্মার্ট চশমাও ভবিষ্যতে স্মার্টফোনের কিছু দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে পারে। তাই প্রশ্নটি শুধু ‘স্মার্ট চশমা কি স্মার্টফোনের বিকল্প?’—এতটুকু নয়। বরং ভবিষ্যতের ডিজিটাল জীবন কতটা বদলে দিতে পারবে এই ছোট্ট ডিভাইসÑসেটিই এখন দেখার বিষয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

