জুলাই যোদ্ধা

জুলাই যোদ্ধা

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। আমরা যারা ’৫২ কিংবা ’৭১ দেখিনি, তারা বুঝতে পারিনি নারীর এই অবদান। ’২৪-এর আন্দোলন আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তখনকার ভিডিও ফুটেজের দিকে তাকালে একটা শান্তি অনুভব করি। ঘরে-বাইরে ও আন্দোলন-সংগ্রামে আমাদের নারীরা সবসময় অগ্রভাগেই ছিলেন। যেমন ছিলেন শিক্ষার্থীরা, তেমনি অভিভাবকরাও। কথা হয় দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে। চট্টগ্রাম কলেজের অনার্স ফাইনাল বর্ষের শিক্ষার্থী নেভী দে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

নেভী দে আন্দোলন নিয়ে বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই মানেই আতঙ্কের। আজও স্মৃতিগুলো বুকের ভেতর কান্নার প্রতিধ্বনি হয়ে ভেসে আসে। চট্টগ্রামে প্রথম আন্দোলন শুরু হয় চাবিতে। কোটার বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন, যা পরে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিয়ে গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরমুখী হয় আন্দোলন। চট্টগ্রাম শহরের আন্দোলন শুরু হয় ষোলশহর থেকে। জুলাইয়ে পুরো মাসব্যাপীই প্রায় প্রতিদিন আন্দোলনে ছিলাম। তাই প্রতিদিনই একেকটা স্মৃতি নিয়ে লিখলে কয়েকটি বই হয়ে যাবে। ৩৮ শিক্ষার্থী প্রতিদিন টেলিগ্রামের একটা গ্রুপে ১১টার পর মিটিং করতাম। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরুর দিকে থাকলেও ১১ জুলাইয়ের পর আর শান্তিপূর্ণ থাকে না। ১১ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বটতলী স্টেশনে আসার পর আমরা টাইপাসে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে প্রথম বাধা দেয়। আমরা শিক্ষার্থীসংখ্যা ১৫০-২০০ হব, কিন্তু পুলিশ তার দ্বিগুণ। সামনে-পেছনে পুলিশ। ব্যানারে ছিলাম আমরা পাঁচ-ছয়জন মেয়ে। একপর্যায়ে আমরা সামনে এগোতে চাইলে পুলিশ আমাদের ওপর চড়াও হয়। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির মুহূর্তে সেখানে ছিলেন মহিলা পুলিশের ডিউটিতে থাকা আমার বড় বোন; তিনি একজন কনস্টেবল। তিনি চান আমি সেফ জোনে চলে যাই। কিন্তু আমি আমার জায়গায় অনড়। আমি তাকে বলি, ‘তোর ডিউটি তুই কর, আমার কাজ আমাকে করতে দে। তুই আমাকে সরে যেতে বলতে পারিস না। এখানে তুই আমার প্রতিপক্ষ।’ একপর্যায়ে পুলিশের ধাক্কায় ব্যানারসহ আমরা নিচে পড়ে যাই। ষোলশহর, টাইগারপাস, নিউমার্কেট ও নতুন ব্রিজ ২নং গেটে প্রতিদিনকার মতো আন্দোলন চলে। যেদিন চট্টগ্রামে ওয়াসিম গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলো সেদিন সারা বাংলাদেশ উত্তাল। সেদিন আটকে পড়ি আমরা মার্কেটে। ৪ আগস্ট নিউমার্কেটের একদম মাঝখানে আমাদের আন্দোলন চলছিল। টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাই না। মুখ-চোখ জ্বলছে তীব্রভাবে। সহযোদ্ধা লাবণী, পুষ্পিতা—এদের খুঁজে হকারে ঢুকে আত্মরক্ষা করি। নতুন ব্রিজে যেদিন আমার সহযোদ্ধা আব্দুল আল জাওয়াদ গুলিবিদ্ধ হন, সেদিন আমরা মেয়েরা এক জায়গায় আত্মরক্ষা করি। অবশেষে গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালাল! জুলাই গণঅভ্যুত্থান! বিজয় এলো!’

বিজ্ঞাপন

কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদা ফাইজার সঙ্গে। ১৫ থেকে ১৮ জুলাই নিয়ে ফাইজা বলেন, ‘জুলাইয়ের ৩ তারিখ থেকে আমি কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিই, ১০ জুলাই পর্যন্ত কোনোরকম বাধা ছাড়া কর্মসূচি করতে পেরেছি। আমাদের প্রথম বাধা আসে ১১ জুলাই।

১৫ জুলাই ছাত্রলীগ পূর্বপরিকল্পিতভাবে আমাদের মিছিলে হামলা করে। এতে আমি, কমিটির অধিকাংশ সদস্য এবং ২৫০-৩০০ সাধারণ শিক্ষার্থী আহত হই। সেই রাতে ভিসির বাসার সামনে আবার আমাদের সহযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ভিসি, প্রশাসনের অন্যান্য সদস্য এবং অনেক শিক্ষক সেখানে উপস্থিত থেকেও আমাদের সাহায্য করেননি। পুলিশ এসে আমাদের বাঁচানোর পরিবর্তে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের সাহায্য করে। মালিহা ও আরো কয়েকজনের লাইভ সেদিন পুরো দেশের মানুষকে জাগিয়ে রাখে। সেই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী ও আমাদের অভিভাবকতুল্য কয়েকজন শিক্ষক ভিসির বাসায় অবরুদ্ধ যোদ্ধাদের বাঁচান এবং ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাসে থেকে বিতাড়িত করেন। এ ঘটনা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এক নজিরবিহীন ইতিহাস।

১৭ তারিখে আমাদের আন্দোলন দমানোর জন্য হল ভ্যাকেন্ট ঘোষণা করা হয় এবং এই ঘোষণা না মানায় বিকালে রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে প্রশাসনের নির্দেশে পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালায়। ১৮ তারিখ সকালে পুলিশ হলে হলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বের করে দেয় এবং হলের গেট সিলগালা করে দেয়। এদিন ভিসির বাসার সামনে থেকে ৩০-৪০ জন মিলে একটা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে যাই। আমরা রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে যাওয়ার পর ১০০ জনের মতো একটা জমায়েত হয় এবং মেইন গেট থেকেও পুলিশ আসতে থাকে।

দুদিক থেকে প্রায় পাঁচশর বেশি পুলিশ আমাদের দিকে আসে। আমরা এ সময় কামালউদ্দীন হলের সামনে অবস্থান নেই। পুলিশ সালাম-বরকত হলের সামনে রাস্তায় ও রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে আমাদের দুদিক থেকে আটকে ফেলে। পুলিশের সঙ্গে কথা বললে নির্দেশনা আসে তখনই ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে যাওয়ার। যেহেতু আমরা অল্প কয়েকজন এবং পুলিশ অনেক, তাই আমরা গেরুয়ার গেট হয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমরা ভাসানী হলের সামনে গিয়ে সবাই মিলে পরের দিনের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করি এবং পুলিশ ছত্রভঙ্গ হয়ে অনেকটাই পিছিয়ে যায়।

এ সময় সাভার থেকে শিক্ষার্থীরা আসে এবং জাবি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা এসে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে বের করে দেয়। আমরা খবর পেয়ে তাদের সঙ্গে যাই। এরপর আর পুলিশ জাবি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেনি। ১৮ তারিখ রাতে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। তার পর থেকে শুরু হয় আমাদের যোগাযোগ নিয়ে সমস্যা। পরবর্তী ১৯ জুলাই প্রথম কারফিউয়ের দিন ক্যাম্পাসের পুরোনো ফজিলাতুন্নেছা হলের সামনে চব্বিশের শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু করা হয়।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...