বাংলায় মুসলমানদের উৎপত্তি বিষয়ক তত্ত্ববিশ্লেষণ

নিম্নবর্ণের হিন্দুদের থেকে বাংলার মুসলমানদের উৎসতত্ত্ব : বয়ান ও বাস্তবতা (পর্ব ২)

ড. মোহেল আলী। অনুবাদ: মোহাম্মাদ আরিফুল ইসলাম

নিম্নবর্ণের হিন্দুদের থেকে বাংলার মুসলমানদের উৎসতত্ত্ব : বয়ান ও বাস্তবতা (পর্ব ২)

একই বছরে (১৮৭২) কলকাতা থেকে এডওয়ার্ড টুইট ডাল্টন রচিত ‘Descriptive Ethnology of Bengal’ বইটি প্রকাশিত হয়। এই বইতে বেভারলির নিম্নবর্ণের হিন্দুদের থেকে বাংলার মুসলমানদের উৎপত্তি-বিষয়ক তত্ত্বের সমর্থন জানানো হয়। এরপর মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে ১৮৮১ ও ১৮৯১ সালে অনুষ্ঠিত দুটি আদমশুমারিতে দেখা যায়, বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে হিন্দুদের চেয়েও বেশি।

১৮৮১ সালে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪১১ এবং হিন্দুদের সংখ্যা ১ কোটি ৭২ লাখ ৪৫ হাজার ১২০। আবার ১৮৯১ সালে মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ৮২ হাজার ৪৮১ এবং হিন্দুদের সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৫।

বিজ্ঞাপন

এই ফলাফল দেখে আদমশুমারি প্রতিবেদনের লেখকরা এবং কতক খ্রিষ্টান মিশনারি পর্যবেক্ষক হঠাৎ করেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, পূর্ববর্তী দুই দশকে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তরের ফলে মুসলিম জনসংখ্যায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। যদিও তারা এই ধারণার পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণ উপস্থাপন করতে পারেননি।

ঊর্ধ্বমুখী জন্মহারের ফলে তখন জনসংখ্যায় সীমিত প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল। কিন্তু পরবর্তী দুটি আদমশুমারিতে যে সংখ্যাগত পার্থক্য দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে তা আদমশুমারি কার্যক্রমের উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং মুসলমানদের পক্ষ থেকে গণনাকারীদের সঙ্গে অধিক সহযোগিতার কারণেই হয়েছিল, যা প্রথম আদমশুমারির ক্ষেত্রে অনুপস্থিত ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট কেউই তখন এই বিষয়টি বিবেচনায় আনেননি।

১৮৯১ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদনের লেখক সিজেও ডনেল লিখেছিলেন, ‘১৮৭২ সালে বাংলায় মুহাম্মদানদের (মুসলমান) সংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ কম ছিল। এখন তাদের সংখ্যা হিন্দুদের চেয়ে দেড় লক্ষাধিক বেশি। ...পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, ১৮৭২ সালের পর থেকে প্রতি ১০ হাজার জন মানুষের মধ্যে উত্তর বাংলায় ১০০ জন, পূর্ব বাংলায় ২৬২ জন এবং পশ্চিম বাংলায় ১১০ জন এবং সমগ্র বাংলায় গড়ে ১৫৭ জন ইসলাম গ্রহণ করেছে। ...মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা বাস্তব এবং উল্লেখযোগ্য। যদি এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে, তবে সাড়ে ছয় শতাব্দীর মধ্যে সমগ্র বাংলার অঞ্চলে মুহাম্মাদের ধর্ম (ইসলাম) সর্বজনীন হয়ে উঠবে; আর পূর্ববঙ্গ প্রায় ছয় শতাব্দীর মধ্যেই একই অবস্থায় উপনীত হবে।’ (Census of India Report- 1891, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২)

এমনকি ‘Indian Musalmans’ গ্রন্থ লিখে ভারতীয় মুসলিম-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারও এই মত সমর্থন করেন। লন্ডন টাইমসে ‘The Religions of India’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি বেভারলির তত্ত্ব পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি লেখেন—‘জেলে, শিকারি, জলদস্যু এবং নিম্নবর্ণের কৃষিজীবীদের মতো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে ইসলাম খোদাপ্রদত্ত বার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এটি ছিল শাসক জাতির ধর্ম; ইসলামের প্রচারকরা ছিলেন আন্তরিক সাধনায় নিবেদিত উদ্দীপনাপূর্ণ ব্যক্তি, যারা এক পরিত্যক্ত ও নিপীড়িত জনসমষ্টির নিকট আল্লাহর একত্ব এবং তার দৃষ্টিতে মানুষের সাম্যের বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন। দীক্ষার যে আচার এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল, তা ধর্মত্যাগকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে এবং নতুন ধর্মাবলম্বী ও তার উত্তরাধিকারীদের চিরকালের জন্য সত্যিকার বিশ্বাসীতে পরিণত করে। এভাবেই ইসলাম দ্রুততম ও ঘনতম জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ধারণ করার সক্ষমতাসম্পন্ন ভারতের সর্বাধিক উর্বর পলিমাটির প্রদেশে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।’ (The Times, London, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৮)

ইসলামে সমতার চেতনা সম্পর্কে হান্টারের বক্তব্য নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু এই আলোচনায় বৈপরীত্য বিদ্যমান। কোনো সুদূর অতীতে সংঘটিত ঘটনার ভিত্তিতে নয়; বরং ১৮৭২ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে বাংলায় মুসলমানদের কথিত সংখ্যাবৃদ্ধির ব্যাখ্যা হিসেবে তিনি এই যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। অথচ সেই সময়ে মুসলমানরা দেশের শাসকও ছিল না এবং খ্রিষ্টান মিশনারিদের মতো কোনো সংগঠিত ইসলাম ধর্মপ্রচারের কার্যক্রমও সেখানে ছিল না। তদুপরি যেমনটা আগেই বলা হয়েছে, উল্লিখিত সময়কালে কোনো নিম্নবর্ণের হিন্দুর ইসলামে ধর্মান্তরের একটি নির্দিষ্ট উদাহরণও কোনো লেখক উপস্থাপন করতে পারেননি।

(এখানে লক্ষণীয় যে, সেই সময়ে নিম্নবর্গের কোনো একজন হিন্দুও খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হলে হিন্দু-মালিকানাধীন কলকাতার সংবাদপত্রগুলো তীব্র প্রতিবাদ ও আলোচনা-সমালোচনা করত। ইসলামে এ ধরনের কোনো ধর্মান্তর ঘটলে তাদের নজর এড়িয়ে যেত না, বরং আরো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতো। —মোহর আলী)

যাহোক, শেষ পর্যন্ত এই তত্ত্বকে প্রায় আনুষ্ঠানিকভাবে সুসংগঠিত ও সংহত করা হয় ১৮৯২ সালে এইচ এইচ রিসলির ‘The Tribes and Castes of Bengal’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে। এই বইয়ের আলোচনায় রিসলি নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তর-তত্ত্বের সঙ্গে নৃতাত্ত্বিক মাত্রা যোগ করেন। তিনি বইটিতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের—এমনকি কিছু মুসলমানেরও নাসিকার উচ্চতা পরিমাপের ফলাফল উপস্থাপন করেন এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বাংলার মুসলমানরা মূলত হিন্দুদের সর্বনিম্ন শ্রেণি থেকে ধর্মান্তরিত। (The Tribes and Castes of Bengal, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা ৯১)

নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তর-তত্ত্বের সমালোচনা

বাংলায় বিপুল মুসলিম জনসংখ্যার অস্তিত্ব সম্পর্কে শাসকদের হঠাৎ সচেতন হয়ে ওঠা এবং সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনার দ্রুত ব্যাখ্যা খোঁজার তড়িঘড়ি প্রচেষ্টার ফল ছিল বেভারলি-রিসলির এই তত্ত্ব। স্বাভাবিকভাবেই এই তত্ত্বকে চ্যালেঞেএজর মুখে পড়তে হয়। মুসলিমদের উৎপত্তি বিষয়ে এই অযাচিত ও স্পষ্টতই অতিরঞ্জিত সর্বব্যাপী ধারণার বিরুদ্ধে মুসলিম সমাজের ক্ষোভ লিখিতভাবে ব্যক্ত করেন মুর্শিদাবাদের তৎকালীন (নামমাত্র) নবাবের দেওয়ান খন্দকার ফজলে রাব্বি; তিনি নিজেও একজন বিদেশি বংশোদ্ভূত মুসলিম ছিলেন।

মুসলিম বাংলার ইতিহাস-সংক্রান্ত সমসাময়িক সূত্রগুলো অধ্যয়ন করে ১৮৯৩ সালে তিনি ফারসি ভাষায় ‘হাকিকতে মুসলমানে বাঙ্গালাহ’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। ‘The Origin of the Musalmans of Bengal’ নামে ১৮৯৫ সালে এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

খন্দকার রাব্বি উল্লেখ করেন, ১২০৩ সালে বাংলায় প্রথম মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশদের দেওয়ানি লাভ পর্যন্ত মোট ৫৬২ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে এই দেশে মুসলিম শাসন বিদ্যমান ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে ৭৬ জন মুসলিম গভর্নর, শাসক ও নাজিম ধারাবাহিকভাবে বাংলায় শাসন করেছেন। তাদের মধ্যে ১৬ জন গভর্নর ঘোরি ও খলজি সম্রাটদের নিযুক্ত প্রতিনিধি ছিলেন; ২৬ জন ছিলেন স্বাধীন-সার্বভৌম শাসক; তাদের মধ্যে শের শাহের সমসাময়িক শাসকরাও অন্তর্ভুক্ত এবং অবশিষ্ট ২৪ জন ছিলেন মোগল সম্রাটদের অধীনে নিযুক্ত নাজিম। এই ৫৬২ বছরে যারা দেশ শাসন করেছেন রাজা কানস, জালালউদ্দিন শাহ, আহমদ শাহ এবং রাজা তোদরমল ও মানসিংহ ব্যতীত, তাদের প্রায় সবাই ছিলেন আফগান, মোগল, ইরানি বা আরব বংশোদ্ভূত।

এই শাসকদের বিদেশি উৎসের ফলেই আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান, ইরান, আরব, ভারতের দূরবর্তী অঞ্চল এবং অন্যান্য দেশ থেকে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার বহু মুসলমান বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন। (The Origin of the Musalmans of Bengal, খন্দকার ফজলি রাব্বি, পুনর্মুদ্রণ: Journal of the East Pakistan History Association, খণ্ড: ১, সংখ্যা: ১ (মার্চ ১৯৬৮), পরিশিষ্ট: A, পৃষ্ঠা: ৬, ১১-১২)। সেই শাসকদের নীতিও ছিল নিজেদের ক্ষমতা ও শাসনকে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে নিজস্ব জাতি ও ধর্মের মানুষদের বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে এনে শাসনাধীন এলাকায় বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করা। এভাবে তারা শহর, গ্রাম ও বসতিগুলোতে মানুষের বসতি গড়ে তুলেছিলেন। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৪)

এই বক্তব্যের সমর্থনে রাব্বি উল্লেখ করেন, মুসলিম বসতি স্থাপনকারীদের নামে বাংলার অনেক শহর, গ্রাম, বাজার, পরগনা ও জেলার নাম রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ ও নানাবিধ খাজনামুক্ত জমির অস্তিত্বও এর পক্ষে সাক্ষ্য বহন করে। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৬-২৮)

বেভারলি ও অন্যান্য লেখকের রচনায় ইঙ্গিত করা হয়েছে, মুসলিম শাসকেরা নিম্নবর্ণের স্থানীয় জনগণের ওপর জোরপূর্বক ইসলাম চাপিয়ে দিয়েছিল। খন্দকার রাব্বি এই তত্ত্ব পর্যারোচনা করে তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপন করে যুক্তি দেন, যদি এটা সত্যিই ঘটত তাহলে উচ্চবর্ণের লোকদেরও জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হতো; কারণ বাস্তবে তারাই মুসলমানদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে ছিল। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩০)

বাংলার মুসলমানদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, প্রাথমিক যুগের মুসলিম বসতিস্থাপনকারীদের জাতিগত ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য যা-ই হয়ে থাকুক না কেন, দীর্ঘকাল ধরে নানান জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশ্রণ এবং জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা, পেশা ও অভ্যাসের প্রভাবে সেসব বৈশিষ্ট্যের স্বাভাবিকভাবেই উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে। এর সঙ্গে গত দেড় শতাব্দী ধরে তাদের ওপর আপতিত দারিদ্র্য ও কঠোর জীবনসংগ্রামের প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪৬-৪৭)। তবুও তিনি দাবি করেন, আরব ও অনারব বংশোদ্ভূত বাংলার মুসলমানদের শারীরিক গঠন ও মুখাবয়বের সঙ্গে এ দেশের হিন্দুদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪৬)। রাব্বি বাংলায় মুসলমানদের অভিবাসনের কয়েকটি নির্দিষ্ট উদাহরণও উল্লেখ করেছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন