৫ আগস্ট: শাহবাগের পথে, একটি জাতির মুক্তির সকাল

৫ আগস্ট: শাহবাগের পথে, একটি জাতির মুক্তির সকাল
মো. তরিকুল ইসলাম তারিক

কোন কোন দিন ইতিহাসের পাতায় শুধু একটি তারিখ হয়ে থাকে না; একটি জাতির আত্মপরিচয় হয়ে ওঠে। ৫ আগস্ট, ২০২৪ তেমনই একটি দিন। এমন একটি সকাল, যার প্রতিটি মিনিট আজও জীবন্ত। চোখ বন্ধ করলেই ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া রাজপথ, মানুষের ছুটে চলা, গুলির শব্দ আর বিজয়ের প্রত্যাশায় কাঁপতে থাকা হাজারো মুখ ভেসে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

সেদিন সকাল সাড়ে আটটার দিকে শহীদ মিনারে পৌঁছানোর চেষ্টা করি। কিন্তু পুরো এলাকা তখন কার্যত অবরুদ্ধ। মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও ছররা গুলি ছুড়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হচ্ছিল। একের পর এক শিক্ষার্থীকে আটক করা হচ্ছিল। বাতাসে বারুদের গন্ধ, চোখে টিয়ার গ্যাসের জ্বালা, আর চারদিকে শুধু মানুষের দৌড়।

টিএসসির দিকে অগ্রসর হতে থাকি। পথে দেখেছি, শুধু আন্দোলনকারী নয়; মাঝবয়সী কোনো পথচারীকেও সন্দেহ হলেই আটক করা হচ্ছিল। টিএসসির কাছাকাছি আমাকেও আটকের চেষ্টা করা হয়। সেই মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কয়েকজন সদস্য এগিয়ে না এলে হয়তো সেদিনের গল্পটি অন্যরকম হতে পারত। তাদের পরামর্শে আমি পলাশী বাজারের দিকে চলে যাই। নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে যাওয়া সেই পথই পরে আন্দোলনের নতুন সূচনাস্থল হয়ে উঠবে—তখন তা কল্পনাও করিনি।

সেদিন আমি প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করেছিলাম—একটি সরকার যখন নিজের জনগণকে ভয় পেতে শুরু করে, তখন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে আতঙ্ক।

পলাশীতে পৌঁছে দেখলাম, কেউই ঘরে ফিরতে রাজি নয়। দুইজন, তারপর চারজন, আটজন, ষোলজন—এভাবেই ছোট ছোট দল একত্র হতে লাগল। অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ত্রিশ-চল্লিশ জনে পরিণত হলাম। শুধু শিক্ষার্থী নয়, পলাশী বাজারের ব্যবসায়ীরাও এসে আমাদের সঙ্গে দাঁড়ালেন। তখন মনে হচ্ছিল, আন্দোলনের মালিকানা আর কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে নেই; এটি পুরো জনগণের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

পলাশী মোড়ে, বর্তমান শহীদ আবরার ফাহাদের স্মরণে নির্মিত আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভের কাছে আমরা সিদ্ধান্ত নিই—শাহবাগে যেতেই হবে। কারণ আমরা জানতাম, শাহবাগ শুধু একটি মোড় নয়; এটি প্রতিরোধের প্রতীক, মানুষের মিলনস্থল, প্রতিবাদের হৃদস্পন্দন।

রাস্তাতেই আমরা নফল নামাজ আদায় করি। মহান আল্লাহর কাছে সাহস, ধৈর্য ও বিজয় কামনা করি। এরপর শাহবাগের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিলে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল আমাদের থামায়। আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে, তাদের আচরণ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ নয়; বরং সংযত। দলটির প্রধান আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনারা আড়াইটা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ধৈর্য ধরুন।’ কিন্তু ইতিহাস কখনো অপেক্ষা করতে শেখে না। আমরাও অপেক্ষা করিনি।

১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে আমরা এসএম হল, ফুলার রোড, ভিসি চত্বর, কলাভবন, রোকেয়া হল পেরিয়ে রাজু ভাস্কর্যের দিকে এগিয়ে যাই। সেখানে পৌঁছে দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক আন্দোলনের সমর্থনে অবস্থান করছেন। তাদের উপস্থিতি আমাদের সাহসকে আরও দৃঢ় করে।

এরপর আমরা শাহবাগের দিকে এগিয়ে চলি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর তখনও পুলিশের ছোড়া গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। চারুকলা পেরিয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কাছে পৌঁছালে আবারও সেনাবাহিনীর একটি টহল দল আমাদের সামনে দাঁড়ায়। এ সময় আমাদের মিছিলের বড় একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আমরা মাত্র আট-দশজন দৃঢ়ভাবে রয়ে যাই।

সেই মুহূর্তে সংখ্যার হিসাব করার সময় ছিল না। কারণ ইতিহাসে অনেক বড় পরিবর্তনের শুরু হয়েছে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের সাহস থেকেই। সেনাবাহিনীর বাধা পেরিয়ে ধীরে ধীরে আমরা শাহবাগ থানার সামনে পৌঁছাই। আমার স্মৃতিতে, তখনও সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ অস্ত্রসহ অবস্থান করছিল। আমি লাঠি হাতে সামনে এগোতেই পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায় এবং আমরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাই।

আনুমানিক সকাল সাড়ে এগারটার দিকে আমরা শাহবাগে অবস্থান নিতে সক্ষম হই। এরপর যা ঘটেছে, তা আর ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি নয়; সেটি একটি জাতির ইতিহাস।

অল্প সময়ের মধ্যেই শাহবাগ মানুষে মানুষে পূর্ণ হয়ে যায়। কোথা থেকে এত মানুষ এলো—আজও তার হিসাব মেলাতে পারি না। মনে হচ্ছিল, যেন পুরো বাংলাদেশ শাহবাগে এসে মিলিত হয়েছে। কেউ কাউকে ডাকেনি, তবুও সবাই এসে পৌঁছেছিল। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা তখনও আসেনি, কিন্তু মানুষের মুখে মুখে তখন বিজয়ের আলো। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ অন্ধকারের শেষে সূর্য উঠতে আর বেশি দেরি নেই।

আজ যখন সেই দিনের কথা ভাবি, তখন বুঝতে পারি—ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তির সৃষ্টি নয়। ইতিহাস রচনা করেন সেই অজানা শিক্ষার্থী, যিনি টিয়ার গ্যাস উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যান; সেই দোকানদার, যিনি ব্যবসা ফেলে আন্দোলনকারীর পাশে দাঁড়ান; সেই শিক্ষক, যিনি সত্যের পক্ষে অবস্থান নেন; সেই সাংবাদিক, যিনি ঝুঁকি নিয়ে একজন মানুষকে অন্যায় আটকের হাত থেকে রক্ষা করেন; আর সেই অসংখ্য নামহীন মানুষ, যাদের সাহস মিলেই একদিন একটি স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়।

৫ আগস্ট একটি শিক্ষা দিয়েছে—অস্ত্র মানুষের শরীরকে থামাতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কখনো থামাতে পারে না। সময় হয়তো অনেক কিছু বদলে দেবে। মানুষ অনেক কিছু ভুলে যাবে। কিন্তু যারা সেদিন রাজপথে ছিল, যারা ধোঁয়া, গুলি, আতঙ্ক আর মৃত্যুভয়কে অতিক্রম করে শাহবাগের দিকে হেঁটেছিল, তাদের হৃদয়ে ৫ আগস্ট চিরকাল বেঁচে থাকবে।

কারণ সেদিন আমরা শুধু একটি মোড় দখল করিনি; আমরা ভয়ের ওপর সাহসের, স্বৈরাচারের ওপর জনগণের, আর অন্ধকারের ওপর আলোর বিজয় প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

লেখক: যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন