ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ছয় মাসের মাথায় গণহত্যাকারীদের পুনর্বাসনের নানা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে দিল্লির আশ্রয়ে থাকা হাসিনা আবার তৎপর হয়ে ওঠেন। দেড় হাজার মানুষকে হত্যা এবং ২০ হাজার মানুষকে আহত, পঙ্গু ও অন্ধ করার পরও ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় ছাত্র-জনতা ছিল বিক্ষুব্ধ।
এ সময়ের মধ্যে ভারত তার সফট পাওয়ারগুলোকে ছয় মাসের মধ্যে সক্রিয় করে তোলে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে থাকা ভারতীয় অনুচররা বিভেদের রাজনীতি উসকে দিতে থাকে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে হাসিনা নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অনুশোচনাহীনভাবে অভ্যুত্থানকে নাকচ করে দেন। হাসিনা ও ভারতের এই ঔদ্ধত্যে মানুষের সংবিৎ ফিরে আসে।
অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ যে অন্যরকম রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অর্জন করেছে, তা থেকে অনুধাবন করতে পেরেছে তাদের আবার রাজপথে নামতে হবে। ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘর ভেঙে দিতে না পারলে আবার যে ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, তা বুঝতে তাদের সমস্যা হয়নি। ছাত্রদের বুলডোজার কর্মসূচির মাধ্যমে তারা আবার ঐক্য গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে এবং সফলভাবে ফ্যাসিবাদের প্রতীকগুলো ভেঙে দিতে পেরেছে।
সারা দেশে আওয়ামী স্থাপনাগুলো যেভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তার দায় হাসিনা ও ভারতের। অন্তর্বর্তী সরকার সঠিকভাবে তা ব্যাখ্যা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা আত্মদান করেছেন, শেখ হাসিনা তাদের অপমান করেছেন, অবমাননা করেছেন। শহীদের মৃত্যু-সম্পর্কিত অবান্তর, আজগুবি ও বিদ্বেষমূলক কথা বলে পলাতক শেখ হাসিনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অবজ্ঞা করেছেন এবং অশ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও অমানবিক প্রক্রিয়ায় নিপীড়ন চালিয়ে ক্ষমতায় থাকাকালে যে সুরে কথা বলতেন, গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়ার পরেও তিনি একই হুমকি-ধমকির সুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া প্রতিটি মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলে চলেছেন, হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। শেখ হাসিনা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির হুমকি দিয়েছেন।’
শেখ হাসিনা গত দেড় দশকে দিল্লির পরিকল্পনা ও পরামর্শে নিপীড়নমূলক শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখন দিল্লিতে পলাতক জীবনে তিনি প্রতিটি পদক্ষেপ নিচ্ছেন ভারত সরকার ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শমতো। যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, হাসিনার বক্তব্যে ভারতের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, হাসিনাসহ সব অপরাধী এখন ভারতের আশ্রয়ে আছে। সেখানে বসে প্রকাশ্যে গৃহযুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে। হাসিনা নিজে ছাত্রনেতাদের বাড়ি বাড়িÑএমনকি শ্বশুরবাড়িতে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। ভারতে বসে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার দায় অবশ্যই ভারতকে নিতে হবে।
ভারত সরকার হয়তো ভাবছে, অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রিয়তা কমেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছুটা বিভেদ তৈরি হয়েছে। ফলে হাসিনাকে আবার সামনে আনার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যাতে ছত্রখান আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করে রাস্তায় নামিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু সেই পরিকল্পনা শুধু ব্যর্থ হয়নি, মানুষকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। যার মাধ্যমে ভারতের কূটকৌশলের পরাজয় হয়েছে।
ভারত বরাবর বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনার পতন ও পলায়ন ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের জন্য বড় বিপর্যয়। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই পতন এখনো মেনে নিতে পারছে না। ফলে তারা কোনোভাবেই বাংলাদেশের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতকে প্রকাশ্য বার্তা দিয়েছিলেন, হাসিনা যেন চুপ থাকেন।
হাসিনা এ দেশের মানুষের কাছে একজন রক্তলোলুপ, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও ক্ষমতালোভী এক নারী ছাড়া কিছু নন, যিনি শত শত মানুষের গুম-খুন ও হত্যার নির্দেশদাতা। অপরদিকে ভারতের কাছে হাসিনা হচ্ছে কৌশলগত এক সম্পদ, যাকে যেকোনো অবস্থায় তারা ব্যবহার করতে পারেন। ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কৌশলবিদরা এখনো মনে করেন, হাসিনাকে ব্যবহার করে এ দেশে আবারো ভারতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এ কারণে তারা আবার হাসিনাকে সামনে আনার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশের মানুষ ভারতের এসব ষড়যন্ত্রমূলক বালখিল্য তৎপরতার কড়া জবাব দিয়েছেন। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার আর কোনো সুযোগ নেই। ‘দিল্লি না ঢাকা-ঢাকা’ স্লোগানের মাধ্যমে সারা দেশে ফ্যাসিবাদী আইকনগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে তারা জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতের ইচ্ছা কখনো পূরণ হবে না।
দিল্লি থেকে হাসিনা যত বেশি তৎপর হবে, তার দলের নেতাকর্মীরা তত বেশি জনরোষের সম্মুখীন হবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া বিবৃতিতে ভারত সরকারকে সে বার্তাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে একজন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব। সরকার আশা করে, ভারত যেন তার ভূখণ্ডকে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে এমন কাজে ব্যবহৃত হতে না দেয় এবং শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেয়।
ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কূটনীতিক আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বুঝতে হবে, ৫ আগস্টের আগের বাংলাদেশ এবং পরের বাংলাদেশ এক নয়। এ দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন থেকে ভারত যে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সফট পাওয়ার বা কোমল শক্তি ব্যবহার করে আসছিল, তাদের সে তৎপরতা সর্ম্পকে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা চিনে ফেলেছে, কোন দলে কারা কীভাবে ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। সাংস্কৃতিক তৎপরতার নামে এ দেশের অনেক নট-নটী শিল্পীরা যে ভারতের গোয়েন্দা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, তাও অজানা নয়।
শেখ হাসিনা ও ভারত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার আগে তার দলের নেতাকর্মীদের অস্ত্রহাতে নামিয়ে জনতার মুখোমুখি করেছিলেন। সে সময় ছাত্র আন্দোলনের নেতা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ততটা জনরোষের মুখে পড়তে হয়নি। সেনা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের নীরব সম্মতিতে আওয়ামী লীগের প্রথম সারির সব নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। দেশের মানুষ এ নিয়ে বড় ধরনের কোনো প্রশ্ন তোলেনি।
এ দেশের মানুষ একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চায়। কিন্তু শেখ হাসিনা দিল্লির গুটি হিসেবে বাংলাদেশকে আবার অস্থির করে তুলতে চাইছেন। হাসিনা কখনোই তার দলের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক স্বার্থ দেখেননি। তিনি নিজেই বলেছিলেন, তার চাই ‘পাওয়ার’। ক্ষমতার মদমত্ততার পরিণতি হিসেবে দলের নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে তিনি পালিয়ে গেছেন। এখন আবার তিনি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। তার বক্তব্যে এর প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে। তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। তিনি তার বক্তব্যে গুম, খুন ও টাকা পাচারের মতো বিষয়গুলোকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বারবার বলছেন, তার কোনো দোষ নেই। পুরো ছাত্র অভ্যুত্থানকে তিনি একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরছেন।
শেখ হাসিনা ভালোভাবেই জানেন, এ দেশের রাজনীতিতে তার আর ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। পালিয়ে যাওয়া কোনো স্বৈরাচার রাজনীতিতে ফিরতে পারে না, ফেরা সম্ভব নয়। শেখ হাসিনার পতনের আগে-পরে আরো কয়েকটি দেশের স্বৈরশাসক বা পুতুল শাসক দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। যেমন আফগানিস্তানের আশরাফ গানি দেশটিতে ফিরবেন, এমনটা কেউ কল্পনাও করেন না। বাশার আল আসাদ কখনো সিরিয়ায় ফিরবেন না। তেমনি তিউনিসিয়ার বেন আলি বা উগান্ডার ইদি আমিন বিদেশে মারা গেছেন, দেশে ফিরতে পারেননি। শেখ হাসিনাও আর কখনো ফিরতে পারবেন না।
ভারতকে বুঝতে হবে হাসিনাকে নিয়ে তাদের খেলা বুমেরাং হবে। বাংলাদেশের মানুষ জানে ভারতের সমর্থন ছাড়া দেড় দশকে হাসিনা এ দেশের মানুষের ওপর নিপীড়ন চালাতে পারতেন না। বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যা, গুম ও খুনের সঙ্গে ভারতের জড়িত থাকার প্রমাণ এ দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারত পররাষ্ট্র সচিব পাঠিয়ে এরশাদকে নির্বাচনে নিতে বাধ্য করেছিল, যে নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিল।
বাংলাদেশ থেকে গুম হওয়া বিএনপির সিনিয়র নেতা সালাউদ্দিন আহমদকে ভারতে পাওয়া গিয়েছিল। মাওলানা সাঈদীর মামলার সাক্ষীকে ভারতের কারাগারে কাটাতে হয়েছে। ভারতের সংশ্লিষ্টতার এর চেয়ে আর কী প্রমাণ দরকার? বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা যে ভারতের কলোনি বানিয়েছিলেন, তা বোঝা কোনো কঠিন বিষয় নয়। হাসিনাকে এ দেশের মানুষ দিল্লির দাসী হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তার যেকোনো তৎপরতা এ দেশের মানুষের কাছে ভারতের তৎপরতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ভারতকে বুঝতে হবে, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন দেশের মানুষের অনুভূতি ফিরে পেয়েছে। তারা ফিরে পেয়েছে কথা বলার স্বাধীনতা। মানুষ নির্বিঘ্নে সভা-সমাবেশ ও সরকারের দাবি জানাতে পারছে। এই প্রথম মানুষ স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন সাহসের সঙ্গে সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদ করছে। এমনকি দিল্লিতে বসে হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্যর জন্য ভারতের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে। সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপ এ দেশের মানুষের আত্মমর্যাদাবোধকে জাগিয়ে তুলছে।
ভারত যদি মনে করে বাংলাদেশে বিভিন্ন দলে থাকা অনুচরদের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করা সম্ভব হবে, তা হবে ভুল। কোনো রাজনৈতিক দল যদি এমন কৌশলের ফাঁদে পা দেয়, তাহলে সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। হাসিনা পালানোর ছয় মাস পর ছাত্র-জনতার জেগে ওঠা সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


