আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রচার কার্যক্রম শুরু হলেও শান্ত পরিবেশ দ্রুত ভেঙে পড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বাগ্যুদ্ধ ও প্রচারে বাধা দেওয়ার ঘটনা এখন সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় একাধিক দলের কর্মী হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে গত বুধবার শেরপুরের ঝিনাইগাতী এলাকায় নির্বাচনি সহিংসতায় একজন নিহত হওয়ার পর থেকেই সতর্ক অবস্থায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যেকোনো সময় নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কায় সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতীক বরাদ্দের আগেই বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপাররা প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ব্যালটের মাধ্যমে; সহিংসতা ও রেষারেষির মাধ্যমে নয়। প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রার্থীর সমর্থকরা প্রচার চালিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
পুলিশের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সহিংসতা আরো বাড়তে পারে। এ কারণে আগেভাগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। যদিও পুলিশ বলছে, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি। যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, প্রচার কার্যক্রম শুরুর পর এখন পর্যন্ত অন্তত ১০টি জেলায় নির্বাচনি সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের পক্ষ থেকে বেশকিছু আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি প্রচারের বাকি সময়জুড়ে পুলিশি টহল জোরদার থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ যেন একই স্থানে সমাবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও নজর রাখা হবে।
এছাড়া থানা সদর বা জেলা সদর থেকে দূরের যেসব এলাকায় প্রার্থীরা প্রচার চালাবেন, সেখানে আগেভাগেই পুলিশ মোতায়েন থাকবে। সহিংসতায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ আরো জানায়, সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী ইন্ধন দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবশ্য সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তা নিয়ে বেশ আগে থেকেই উদ্বেগ জানিয়ে আসছিলেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গতকাল বৃহস্পতিবার রাজারবাগে সাংবাদিকদের বলেন,
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সহিংসতা যাতে না ঘটে, সেজন্য সব বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আইজিপি বাহারুল আলম গতকাল রাতে আমার দেশকে জানান, নির্বাচনি প্রচার কার্যক্রমে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় নির্বাচনি প্রচারের সময় ঢাকা-৮ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম হামলার ঘটনা ঘটে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা ওই হামলা চালিয়েছে।
এছাড়া শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহত হন। গত ২৭ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের জেরে সম্প্রতি সংঘর্ষে জড়ান শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা।
ঢাকা-১৮ আসনে ১১ দলীয় জোটের এনসিপির প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিবের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গত ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর খিলক্ষেতের ডুমনি বাজারে গণসংযোগকালে এ ঘটনা ঘটে।
সূত্র জানায়, কয়েক দিন আগে মিরপুরে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়ান। গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কদমতলীতে এক নারী কর্মীকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা পুলিশের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, নির্বাচন উপলক্ষে পিকেট পার্টি ও মোবাইল টিমের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যেসব এলাকায় ইতোমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে আগাম নিরাপত্তা আরো জোরদার করা হয়েছে।