কোরবানির ঈদ সামনে রেখে নারিকেল আমদানির অনুমতি নিয়ে লুকোচুরি শুরু করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিইএ)। ‘এটি আমদানির মৌসুম নয়’—এমন অজুহাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আমদানি অনুমতিপত্রে (আইপি) সম্মতি দিচ্ছে না সংস্থাটি। এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ডিইএর মহাপরিচালকের (ডিজি) সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি।
ফলে দেশের বাজারে চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে আগে থেকেই নারিকেল আমদানি করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন বিপাকে পড়েছেন। পণ্য খালাসের অপেক্ষায় সোনামসজিদ স্থলবন্দরের ভারত সীমান্তে ট্রাকভর্তি নারিকেল আটকে থাকায় প্রতিদিন বাড়ছে তাদের ব্যয়।
এদিকে, দেশীয় উৎপাদন ঘাটতির কারণে কোরবানির ঈদের আগে বাজারে নারিকেলের দাম অস্বাভাবিক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, আমদানির অনুমতি না দিলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে। সে সময় একটি ভালো মানের নারিকেল কিনতে গ্রাহককে গুনতে হতে পারে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।
ডিইএ সূত্রে জানা গেছে, কৃষিপণ্য আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনুমতি প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে মৌসুমি পণ্যের ক্ষেত্রে দেশের উৎপাদন ও চাহিদার ভারসাম্য বিবেচনায় রেখে আমদানি-রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়।
ডিইএর কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত রোজার ঈদ, শীত মৌসুম, নবান্ন এবং পূজা-পার্বণকে কেন্দ্র করে নারিকেল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। তবে এবার কোরবানির ঈদ উপলক্ষে নারিকেল আমদানিতে সম্মতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের যুক্তি, কোরবানির ঈদে পিঠা-পায়েস বা সেমাই তৈরির প্রচলন তুলনামূলক কম থাকায় আমদানির অনুমতি দিলে দেশীয় চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিইএর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (আমদানি) কৃষিবিদ মোহাম্মদ শওকত ওসমান মজুমদার আমার দেশকে বলেন, নারিকেল আমদানির জন্য কয়েকজন ব্যবসায়ী আবেদন করেছেন। কিন্তু আমরা এখন অনুমতি দিচ্ছি না। কারণ কোরবানির ঈদে নারিকেলের চাহিদা কম থাকে। যারা আবেদন করেছেন তাদের সংখ্যাও কম। মূলত রোজার ঈদ, নবান্ন, শীত মৌসুম এবং পূজা-পার্বণে নারিকেলের চাহিদা বেশি থাকে। তাই পরে অনুমতি দেওয়া হবে।
হর্টিকালচার শাখার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩৬ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে নারিকেলের চাষ হয়। এসব জমি থেকে বছরে প্রায় চার লাখ ৭৮ হাজার ১৯৭ টন নারিকেল উৎপাদিত হয়। তবে চাহিদা নিরূপণের ব্যবস্থা না থাকায় কিছুটা বিভ্রান্তি দেখা যায়।
সবচেয়ে বেশি নারিকেল উৎপাদন হয় ভোলা, বাগেরহাট, নোয়াখালী, বরিশাল ও যশোরে। ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু ভোলাতেই উৎপাদন হয়েছিল ৮৮ হাজার টন নারিকেল। ওই সময় দেশে ভোগের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৭৯ লাখ টন। ২০২৩ সালে মাথাপিছু নারিকেল ভোগের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৬৪ কেজি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অতিরিক্ত গরম ও গাছের রোগবালাইয়ের কারণে অনেক সময় নারিকেল পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগেই ব্যবসায়ীরা কাঁচা অবস্থায় ডাব হিসেবে বিক্রি করে দেন। ফলে বাজারে নারিকেলের সংকট তৈরি হয়। এ কারণে প্রতি বছর ভারত থেকে ৬০০ থেকে ৭০০ টন নারিকেল আমদানি করতে হয়।
বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ঠেকিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নারিকেল সরবরাহ নিশ্চিত করতেই ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে নারিকেল আমদানি করে থাকেন। ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ু ও কর্ণাটক অঞ্চল থেকে এসব নারিকেল আমদানি করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য খালাস করা হয়।
প্রতি বছরের মতো এবারও কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা নারিকেল আমদানির প্রস্তুতি নেন। গত ৬ মে রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী ইমপোর্ট পারমিটের (আইপি) জন্য ডিইএর কাছে আবেদন করেন। একইভাবে এমএস মিফা ইন্টারন্যাশনালসহ প্রায় এক ডজন ব্যবসায়ী আবেদন করেছেন। আবেদন করার পর তারা ডিইএর ডিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনুমতি চান। গত রোববারও তারা পুনরায় ডিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে তিনি অধস্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
প্রিয়াম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী প্রিয়াম আমার দেশকে বলেন, আমার চারটি ট্রাকে প্রায় ৯২ টন নারিকেল ভারত সীমান্তে লোড অবস্থায় রয়েছে। ডিইএ আইপির অনুমতি দিলেই বাজারে সরবরাহ করা হবে।
রাশেদ ইন্টারন্যাশনালের মো. রাশেদ করিম বলেন, দেশের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা নারিকেল আমদানি করি। কোরবানির ঈদ লক্ষ্য করে আমার ৮৫ টন পণ্য সীমান্তে অপেক্ষমাণ রয়েছে। কিন্তু ডিইএ আমাদের ক্ষুদ্র পুঁজি ও ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে না। তারা অজুহাত দিচ্ছে—এখন আমদানির মৌসুম নয়।
মেসার্স মন এন্টারপ্রাইজের মধুসূদন চক্রবর্তী বলেন, ডিইএর ডিজির আচরণ আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হয়েছে। তিনি যদি অনুমতি না দেন, তাহলে আমরা বড় ধরনের ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়ব।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের পণ্য স্থলবন্দরে আটকে আছে। অনুমতি না মিললে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব, একই সঙ্গে সরকারও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। আরেক ব্যবসায়ী বলেন, আমদানির অনুমতি না দিলে বাজারে একটি নারিকেল ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হতে পারে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে।