বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব, তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতে চায় দিল্লি। এর মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন একটি অধ্যায় শুরু করতে চায় ভারত। দিল্লি আশা করে সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, যখন দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছিল ঢাকা।
সম্প্রতি দিল্লি সফরে যাওয়া বাংলাদেশের মিডিয়া ডেলিগেশনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে দিল্লিভিত্তিক কৌশলগত ও ভূরাজনীতিবিষয়ক প্রভাবশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাটস্ট্র্যাট’-এর কর্ণধার ও বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ এসব মন্তব্য করেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সচিবালয়সহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এ কূটনীতিক বলেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুটি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তিনি বলেন, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ভারত। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের যে গতি-প্রকৃতি তা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মেলানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দিল্লির সুষমা স্বরাজ ভবনে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় অনুষ্ঠানে পঙ্কজ শরণ ঢাকা-দিল্লি ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন ইস্যু, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, সার্কের পুনরুজ্জীবন, যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রভাব, ভারতের মিডিয়ায় বাংলাদেশবিরোধী প্রচার, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাবসহ বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন সাবেক এ কূটনীতিক।
পঙ্কজ শরণ অভিযোগ করে বলেন, অতীতে নানা কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়টা এমন ছিল, যখন উত্তর-পূর্ব ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের বিষয়ে দিল্লির উদ্বেগ এবং ঢাকার অস্বীকারের কারণে সম্পর্কটি প্রায় ভেঙে গিয়েছিল। তিনি বলেন, আমরা আসলে আটকে গিয়েছিলাম। সে সময়ে কোনো সংলাপ হচ্ছিল না। ভারত কিছু বলত, কিন্তু বাংলাদেশ তা প্রত্যাখ্যান করত। এর ফলস্বরূপ সবাই ভোগান্তির শিকার হয়েছিল এবং আমাদের উদ্যোগগুলো এগোতে পারেনি।
পঙ্কজ শরণ বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের নীতির ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের দেখতে হবে বাংলাদেশের নতুন সরকার চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করে এবং এর মধ্যে ভারতের অবস্থান কোথায়। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত একটি নতুন অধ্যায় রচনা করতে আগ্রহী। নির্বাচনের পরদিনই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি অভিনন্দন বার্তা পাঠান এবং তার পরের দিন তারেক রহমানও সে অভিনন্দন বার্তার স্বীকৃতি জানিয়ে টুইট করে জবাব দেন।
তিনি বলেন, ড. ইউনূস আমলের সম্পর্কের আবহের চেয়ে এটি অনেকটাই ভিন্ন। তাই ভারত নতুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে এবং বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফলকে স্বীকৃতি দিতে তার সদিচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে এক মুহূর্তও নষ্ট করেনি। দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একটি ফোনকল হয়েছিল আর এটিই বাংলাদেশের সঙ্গে এক নতুন ধরনের সম্পর্ক খুঁজে বের করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে বর্তমান বিএনপি সরকারের ওপর আস্থা রাখতে চাইছে দিল্লি। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপিই তো ক্ষমতায় ছিলÑএ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পঙ্কজ শরণ বলেন, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলায়। বাংলাদেশের নতুন এক নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসেছে। মন্ত্রিসভায় অনেক নতুন মুখ দেখছি। সব মিলিয়ে একটি নতুন পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতিতে আমরা বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতে চাই। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হবে। তিনি বলেন, দুদেশের স্বার্থে আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করতে চাই।
তিনি বলেন, ভারত সরকার বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে প্রবীণ রাজনীতিবিদ দিনেশ ত্রিবেদীর নাম ঘোষণা করেছে। ১৯৭১ সালের পর তিনিই প্রথম রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত হাইকমিশনার। এর অর্থ হলো, প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে এমন কাউকে সেখানে পাঠাতে চান, যিনি তার প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং যার ওপর তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। দিনেশ ত্রিবেদী একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং বাংলাদেশের জটিল পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিতে হয়, সে সম্পর্কে তার ধারণা আছে। আপনি আমাদের ইতিহাস, ভূগোল ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করতে পারবেন না। পঙ্কজ শরণ বলেন, আমি শুধু এটুকুই বলব, দিল্লি বা ঢাকায় যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এ বাস্তবতা কখনোই বদলাতে পারে না।
দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন সম্ভব কি নাÑজানতে চাইলে পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ১৭ বছর ধরে লন্ডনে আশ্রয়ে ছিলেন। তাই কেউ ভারত বা অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নেওয়া, এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা একেবারেই ব্যতিক্রম কিছু নয়। এখানে কিছুটা রাজনীতি আছে, কিছুটা আইনি বিষয়ও আছে। বর্তমানে বিষয়টি বেশ সংবেদনশীল এবং আমাদের দেখতে হবে দুই সরকার কীভাবে এটি পরিচালনা করে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা এই প্রথম দিল্লিতে আশ্রয় নেননি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লিতেই ছিলেন। জিয়াউর রহমানের সময়েই, অর্থাৎ বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন। দেশে ফিরে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও শুরু করেন। এখন আবার বিএনপি ক্ষমতায় দেখা যাক কী হয়। রাজনীতিতে অনেক কিছু ঘটতে পারে।
উল্লেখ্য, তারেক রহমান নির্যাতনের শিকার হয়ে লন্ডনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা যখন দিল্লিতে ছিলেন, তখন তিনি একজন ভুক্তভোগী হিসেবে আশ্রয় পেয়েছিলেন। এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন খুনি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছেন শেখ হাসিনা।
সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যা ঘটছে, তা দুর্ভাগ্যজনক। এমনটা মোটেও হওয়া উচিত নয়। এ সমস্যার সমাধান বাংলাদেশ ও ভারত উভয়পক্ষের হাতেই রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধভাবে মানুষ ও পণ্য চলাচল নিশ্চিত করতে একটি অত্যন্ত উন্নত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।
তিনি বলেন, কোনো সরকারই এটা স্বীকার করবে না। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, সীমান্তের অর্থনীতির একটি বড় অংশই অবৈধ, যা দুর্ভাগ্যজনক। এটি চোরাচালান, অস্ত্র ও অপরাধের একটি বিপজ্জনক সংমিশ্রণ তৈরি করেছে, যেখানে সাধারণ মানুষও জড়িয়ে পড়ে। দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা সমাধানের প্রথম ধাপ। আমাদের সে পুরোনো অতীতে ফিরে যাওয়া চলবে না, যেখানে দুদেশের সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে সন্দেহের সম্পর্ক ছিল। সেটি কোনো সমাধান আনবে না। বর্তমানে তাদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করার এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা রয়েছে।
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশ চীনের সহযোগিতায় তিস্তা নদীতে একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে চায়। এটি বাংলাদেশের পছন্দের বিষয়। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে ভারত কোনোভাবেই বাংলাদেশকে থামাতে পারে না। ভারত শুধু বলতে পারে, এটি আমাদের উদ্বেগের বিষয়। কারণ এটি বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদী।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। নতুন করে চুক্তির জন্য যে আলোচনা, সেখানে পানিপ্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি বছর পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য আমি শুনিনি। ৪০ বছরের পানিপ্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ওই চুক্তিতে পানিবণ্টনের ফর্মুলা ঠিক করা হয়েছিল। এবার নতুন চুক্তির জন্য আলোচনায় পানিপ্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি বছর পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠতে পারে।
বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা তৎপরতা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা কার্যক্রমকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয় । প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা থাকে, যাদের কাজ রাষ্ট্রকে রক্ষা করা। এমনকি যুদ্ধাবস্থা না থাকলে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান ও সহযোগিতারও একটি সংস্কৃতি থাকে। তিনি আরো বলেন, যখন যোগাযোগের অন্য সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন বিভেদ দূর করে দেশগুলোকে একত্রিত করার চেষ্টা করাই একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাজ। বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা কার্যক্রম নিয়ে অপপ্রচারটি ভারতবিরোধী গোষ্ঠীর। এ প্রতিবেদনগুলো কতটা সত্য, তা দেখার ক্ষেত্রে আরো বাস্তববাদী হতে হবে। এর কিছু অংশ ভারতের শত্রুদের তৈরি করা গল্পও হতে পারে। ভারতকে যদি বাংলাদেশ সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, তবে তা করা খুবই সহজ। কারণ আমরা একে অপরকে বুঝি।
বিভিন্ন ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতবর্ষে শত শত মিডিয়া রয়েছে। অনেক মিডিয়া জাতীয় পর্যায়ে কাজ করে। আবার অনেক মিডিয়া রয়েছে অঞ্চলভিত্তিক। হ্যাঁ, কোনো কোনো মিডিয়া হয়তো বাংলাদেশবিরোধী প্রচার চালিয়েছে। কিন্তু ঢালাওভাবে বলা যাবে নাÑভারতের সব মিডিয়া বাংলাদেশবিরোধী প্রচারে লিপ্ত ছিল। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপির জয়ে দেশটির কেন্দ্রের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেও একই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকছে। এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বছর পর এবার এমন পরিস্থিতি আসছে, যখন ভারতের কেন্দ্রে ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে একই দলের সরকার থাকবে। বিজেপি সরকার নিয়ে আমি বেশ আশাবাদী। কেননা বাংলাদেশের সঙ্গে এমন অনেক বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে রাজ্যে ও কেন্দ্রের মধ্যে দ্বিমত ছিল। আমি মনে করি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপির জয় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার সার্কের পুনরুজ্জীবন। এ ব্যাপারে ভারতের অবস্থান জানতে চাইলে অনেকটা নেতিবাচক অবস্থান তুলে ধরে পঙ্কজ শরণ বলেন, সার্ক নিয়ে তো আমরা আগে কাজ করেছি। এখনো করা যেতে পারে। তবে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য সার্ক কোনো সুফল বয়ে আনেনি। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তান দরকষাকষি করেছে আর অন্যরা সেখানে ছিল দর্শকের ভূমিকায়। তিনি দাবি করেন, বরং সার্ক কাঠামোর বাইরে দ্বিপক্ষীয়ভাবে দেশগুলোর মধ্যে অর্জন অনেক বেশি।
উগ্রবাদ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এ কূটনীতিক বলেন, উগ্রবাদী আদর্শ বা সন্ত্রাসী সংগঠন যাতে কোনো সুযোগ না পায়, সেজন্য দুদেশকে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে, মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা ভারত ও বাংলাদেশের জন্য হুমকি। তিনি বলেন, উপমহাদেশের দেশগুলোর রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ও প্রভাব বাড়ছে। এটি ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল। ভারতের কথাই যদি বলি, তাহলে আমি বলব, ভারতের রাজনীতির সমীকরণ অত্যন্ত জটিল। কেউ যদি কখনো ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে চায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই দেশটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। আমি মনে করি, বিষয়টি রাজনীতিবিদদের বিবেচনায় রয়েছে।
পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে এবং এর বাইরে ভারতের সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করে পঙ্কজ শরণ বলেন, একদিকে ভারত তার নিজস্ব স্বার্থে নিরাপত্তার ওপর মনোযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ভারত। তিনি বলেন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও মিয়ানমারসহ অনেক দেশই মারাত্মক সমস্যায় রয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কারণে কয়েকটি দেশ উন্নতির ব্যাপক সম্ভাবনা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখাচ্ছে। আমরা দেখছি, নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, এমনকি মালদ্বীপেও প্রকৃত গণতন্ত্র এসেছে এবং নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। চারটি দেশই তাদের রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন যাত্রা শুরু করছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক সবচেয়ে ইতিবাচক ও ভালো সময় পার করছে বলে মন্তব্য করেন এ কূটনীতিক। তিনি বলেন, আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। কূটনৈতিক সম্পর্ক হিমায়িত হয়ে আছে, যার ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পূর্ণ অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পঙ্কজ শরণ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। গত দেড় বছর সে সম্পর্কটি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটন ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য জটিল এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এ জটিল পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবেÑসে প্রশ্নের উত্তর এ মুহূর্তে আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সাবেক এ কূটনীতিক বলেন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সীমান্ত রয়েছে। এসব দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ । সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে আমাদের বিরোধ রয়েছে। কয়েক বছর আগে এ বিরোধ বেশ খারাপ পর্যায়ে যায়। তবে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটছে। আমি আশা করি, সম্পর্ক উন্নয়নের এ ধারা আগামী দিনগুলোতে অব্যাহত থাকবে।
এমবি