বর্ষা মৌসুম শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। মাঝেমধ্যে বৃষ্টিপাতের কারণে নদ-নদীতে তীব্র স্রোতও বইছে। সাধারণত বছরের এই সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোয় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভরা মৌসুমের দ্বারপ্রান্তে এসেও বরিশালের নদ-নদীতে দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত রুপালি ইলিশের।
জানা গেছে, দিনভর নদীতে জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা পাচ্ছেন না জেলেরা। এতে যেমন হতাশায় ভুগছেন তারা, তেমনি বাজারে ইলিশের সংকটের কারণে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারাও। বাজারে অল্প কিছু ইলিশ পাওয়া গেলেও দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে বরিশাল নগরীর পোর্ট রোডের ইলিশ মোকামে গিয়ে দেখা যায়, বাজার প্রায় ইলিশশূন্য। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৫০-৬০ মণ ইলিশ আসে। অথচ অন্যান্য বছরের এই সময়ে প্রতিদিন কয়েকশ মণ ইলিশ আমদানি হতো।
বর্তমানে বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ নেই বললেই চলে। দুয়েকটি পাওয়া গেলেও খুচরা বাজারে সেগুলোর দাম প্রতি কেজি ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশও বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার টাকা কেজি দরে। ছোট আকারের ইলিশ কিনতেও গুনতে হচ্ছে দেড় হাজার টাকার বেশি।
পোর্ট রোড এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ইলিশের সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। জুন মাসে প্রতিদিন অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ মণ ইলিশ বাজারে আসে। কিন্তু চলতি বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, ইলিশের উৎপাদন ক্রমেই কমে যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
মাছ বিক্রেতা মো. আলম বলেন, জাটকা সংরক্ষণে সরকার ও মৎস্য বিভাগের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও তার সুফল বাজারে দেখা যাচ্ছে না। নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। এ সময়ে যেখানে কয়েকশ মণ ইলিশ আসার কথা, সেখানে প্রতিদিন ৫০-৬০ মণ আসছে।
পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মালিক সমিতির সদস্য ইয়ার হোসেন শিকদার জানান, কয়েক বছর আগেও প্রতিদিন ১ হাজার থেকে দেড় হাজার মণ ইলিশ আড়তে আসত। এখন ভরা মৌসুমেও ১ হাজার মণের বেশি ইলিশ পাওয়া যায় না। ফলে একসময়ের কোটি টাকার ইলিশের বাজার সংকুচিত হয়ে কয়েক লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ইলিশ কিনতে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাগর ভৌমিক বলেন, মেয়ের আবদারে ইলিশ কিনতে এসেছি। ৯০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ ২ হাজার টাকা কেজি দরে কিনেছি। বর্তমান দামে সাধারণ মানুষের পক্ষে ইলিশ কেনা প্রায় অসম্ভব। একই অভিযোগ ক্রেতা মো. মারুফ হোসেনেরও। তিনি বলেন, খুচরা বাজারের চেয়ে কম দামে পাব ভেবে পাইকারি বাজারে এসেছিলাম। কিন্তু এখানেও দাম অনেক বেশি। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প কিছু মাছ কিনেছি।
অন্যদিকে নদীতে মাছ না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন জেলেরা। মেঘনা নদীতে মাছ ধরা জেলে সুমন মাঝি বলেন, মৌসুম শুরুর আগে সাধারণত নদীতে ইলিশের আনাগোনা বাড়ে। কিন্তু এবার জালে মাছই পড়ছে না। গত এক মাস ধরে আয় বলতে কিছু নেই। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য আড়ত সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল সিকদার বলেন, নদী তো বটেই, সাগরেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছরগুলোর এই সময়ে ২০০-৩০০ মণ ইলিশ পাওয়া গেলেও এখন ৫০-৬০ মণের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে পরিস্থিতি নিয়ে এখনই উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেখছেন না মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, প্রকৃত ইলিশ মৌসুম শুরু হবে জুলাই মাসে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে সাগর থেকে বড় আকারের ইলিশ নদীতে প্রবেশ করবে। তখন সরবরাহ বাড়বে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, চলতি বছর জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল হয়েছে। অভয়াশ্রমগুলোয় কঠোর নজরদারির ফলে বিপুলসংখ্যক জাটকা সাগরে পৌঁছাতে পেরেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব মৌসুমের শেষভাগে পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া ইলিশের সরবরাহ অনেকাংশে বৃষ্টিপাত ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল।