সন্দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। যার নাম শুনলেই মনে আসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অদ্ভুত হাতছানি। দুঃখ, বঞ্চনা এবং অপেক্ষার দীর্ঘতা; সাগরপথের ভয়াবহতা, অসহায় মানুষের কান্না, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছতে না পারা ছিল সন্দ্বীপবাসীর জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আজ ২৪ মার্চ সেই ইতিহাস বদলে গেল।
সন্দ্বীপবাসীর হাতে ফেরিঘাটের চাবি তুলে দিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন। আজ সকাল ৮টায় ফেরিঘাট উদ্বোধন করেন তিনি। এতে বাস্তবায়ন হলো সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কাছে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাট, আর সেখান থেকে মাত্র এক ঘণ্টার এই ফেরিযাত্রা। এখানকার মানুষ জানান, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তাদের। এই পরিবর্তন শুধু একটি নৌপথের উন্নয়ন নয়, একটি যন্ত্রণাময় যুগের অবসান। একটি নতুন ইতিহাসের শুভসূচনা।
যে মৃত্যু এড়ানো যেত: মঞ্জুর মোরশেদ
মঞ্জুর মোরশেদ সন্দ্বীপের হরিসপুর এলাকার বাসিন্দা। তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ফেরি চালু্র বিষয়ে জানান, তার মামা করোনাকালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলে হয়তো তাকে বাঁচানো যেত। কিন্তু সন্ধ্যার পর সন্দ্বীপের ঘাট বন্ধ হয়ে যায়। কোনো নৌকা পাওয়া যায়নি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। পুরো পরিবার চিৎকার করে কাঁদছিল করছিল, সাহায্যের আকুতি জানাচ্ছিল।
ভোরের আলো ফোটার আগেই অবসান হয় তার মামার জীবন। মঞ্জুরের মা বিলাপ করে বলেছিলেন, “একটা ফেরি থাকলে আমার ভাই আজ বেঁচে থাকতো!”
আকরামের কান্না
মো. আকরাম সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। হঠাৎ প্রসব ব্যথা শুরু হলে তিনি তাড়াহুড়ো করে তাকে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাতের সন্দ্বীপ থেকে শহরে যাওয়ার কোনো নৌযান ছিল না। জোয়ারের পানি বাড়ছিল, বাতাস ছিল উত্তাল। এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করেও কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি।
কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর তার স্ত্রী খুব কষ্টে সন্তান ভূমিষ্ঠ করলেন। কিন্তু সেই নবজাতকের কান্না শোনা গেল না। মায়ের গর্ভেই জীবন-প্রদীপ নিভে যায় তার।
আকরাম আজও সেই রাতের কথা মনে হলে আঁতকে ওঠেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “ফেরিটা আরো আগে এলে আমার সন্তান হয়তো বেঁচে থাকতো!”
২০১৭ সালের ২ এপ্রিল। সীতাকুণ্ড থেকে সন্দ্বীপ যাওয়ার পথে সি-ট্রাক থেকে যাত্রী নামানোর সময় ‘লালবোট’ নামে ছোট নৌকা ডুবে যায়। মুহূর্তে ১৮ জন মানুষ সমুদ্রে তলিয়ে যান।
একজন মা তার ৭ বছরের ছেলেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু উত্তাল সাগর তাকে কেড়ে নিলো। বাবার হাত ফসকে হারিয়ে গেলো একমাত্র মেয়ে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, “আল্লাহ, তুমি কি আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দেবে?”
এসব ভয়াবহ স্মৃতির মুখে দাঁড়িয়ে আজ সন্দ্বীপবাসী এই ফেরি সার্ভিসকে আশীর্বাদ মনে করছে। যদি ফেরি তখন থাকতো তাহলে ১৮টি জীবন অকালে ঝরে যেত না।
২০২২ সালের ২০ এপ্রিল, সন্দ্বীপের এক পরিবার স্পিডবোটে করে শহরে যাচ্ছিল। হঠাৎ ঝোড়ো বাতাস নৌকাটিকে উল্টে দিলো। পরিবারের তিন শিশু একসঙ্গে হারিয়ে গেলো উত্তাল সাগরের বুকে।
বাচ্চাদের বাবা পাগলের মতো পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তাদের খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু যখন খুঁজে পাওয়া গেল, তখন তারা নিথর। তিন ছোট্ট শিশুর কফিনের দিকে বাবা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন।
সেদিন তিনি শুধু বলেছিলেন, “একটা নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকলে আমি আমার তিন সন্তানকে আজ কবরে নামাতাম না।”
সন্দ্বীপবাসী এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর আন্দোলন করেছে। ঢাকায়, চট্টগ্রামে তারা রাস্তায় নেমেছে, জনপ্রতিনিধিদের স্মারকলিপি দিয়েছে, মিছিল করেছে।
“আমরা সন্দ্বীপবাসী” সংগঠনসহ আরও অনেকে এক হয়ে কাজ করেছে। বারবার আশ্বাস এসেছে, কিন্তু কাজ হয়নি। তবে তারা হাল ছাড়েনি। আজ সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল ফেরি সার্ভিস। সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘশ্বাস আজ হাসিতে পরিণত হয়েছে।
দুপুর ১২টায় সন্দ্বীপবাসীর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলবেন। সমাবেশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীর প্রতীক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বক্তব্য দেবেন।