এক সপ্তাহ ধরে অচল চট্টগ্রাম বন্দর
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) বিদেশি অপারেটর নিয়োগসংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়েছে বন্দর। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যৌথ উদ্যোগে ডাকা কর্মসূচি শুরুতে আট ঘণ্টার কর্মবিরতি এখন অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচিতে গড়িয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এ অচলাবস্থা তৈরি হলেও সমাধানের উদ্যোগ নেয়নি কেউ। বন্দর কর্তৃপক্ষ শুরুতে তর্জনগর্জন করলেও সময়ের ব্যবধানে তা বুমেরাং হয়েছে। খোদ নৌপরিবহন উপদেষ্টা আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের ব্যাপারে কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেও শ্রমিক নেতারা তা আমলে নেননি। মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নিয়ে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ১৬ শ্রমিক-কর্মচারীকে বদলির আদেশ দিলেও একজনও চট্টগ্রাম ছাড়েননি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় যেন ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে।
এদিকে, সাত দিনে ইয়ার্ডে কনটেইনারের সংখ্যা ৩৭ হাজার ছড়িয়েছে। বহির্নোঙরে পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২০টিতে। সব মিলিয়ে বড় ধরনের জটের আশঙ্কা করছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। তবে এসব নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক।
গত ৩০ নভেম্বর এনসিটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগসংক্রান্ত একটি রিটের রায় দেয় উচ্চ আদালত। রায়ে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। এর পরই গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটর প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে তোড়জোড় শুরু করে বন্দর ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ। ১ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক চুক্তির সম্ভ্যাব্য তারিখও নির্ধারণ করে উভয়পক্ষ। কিন্তু বেঁকে বসে বন্দর শ্রমিক দল ও স্কপ।
৩১ নভেম্বর থেকেই দৈনিক আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি শুরু করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। একদিন পর আন্দোলনে জড়িত ১৮০ শ্রমিক-কর্মচারীর তালিকা তৈরি করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। দুদিনে পর্যায়ক্রমে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ১৬ জনকে প্রথমে পানগাঁও ও কমলাপুর আইসিডিতে এবং পরে সেখান থেকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনের কাছে কোনোভাবে নতি স্বীকার না করার ঘোষণা দেয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষ। ১৬ জনের পর আন্দোলনে অংশ নেওয়া সবার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেন খোদ নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। কিন্তু উপদেষ্টার হুমকি কিংবা বন্দরের পদক্ষেপ—কোনোকিছুকে পরোয়া করছেন না আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীরা। টানা তিনদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতির পর একদিন ২৪ ঘণ্টা ও পরে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিক- কর্মচারীরা।
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যুগ্ম আহ্বায়ক ও শ্রমিক দলের নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার জানান, শ্রমিকরা জাতীয় স্বার্থে বন্দরের মতো প্রতিষ্ঠানকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এতে বন্দর ব্যবহারকারীদের কিছুটা সমস্যা হলেও জাতীয় স্বার্থে সবাই তা মেনে নিচ্ছেন। বন্দরকে বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়া হবে না—এমন স্পষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও হুঁশিয়ারি জানান তিনি।
বর্তমানে জেটিতে কনটেইনারবাহী পাঁচটি ও চারটি বাল্ক কার্গো জাহাজ বন্দর চ্যানেলে আটকা আছে। এছাড়া বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকা জাহাজের সংখ্যা ১২০টির বেশি। স্বাভাবিক সময়ে এ সংখ্যা থাকে ৬০টির নিচে।
শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী জানান, এভাবে চলতে থাকলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পাশাপাশি বন্দরসংশ্লিষ্ট সবগুলো প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। গত ২০ বছরের মধ্যে একটানা এক সপ্তাহ বন্দর বন্ধ থাকার ঘটনা ঘটেনি। সংকট সমাধানে সরকারের উদ্যোগ কিংবা আন্দোলনকারীদের আন্তরিকতা কোনোকিছুই এখনো দৃশ্যমান নয়। এতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ জানান, বন্দর কোন অপারেটর পরিচালনা করবে, তা নিয়ে আমদানি কিংবা রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমরা দ্রুত সেবা পেতে চাই। এক সপ্তাহ আগেও যা সচল ছিল, সেটি এখন স্থবির। জাতীয় অর্থনীতির চাকা থেমে গেছে। এক ঘণ্টা বন্দর অচল থাকাটাও আমরা কল্পনা করতে পারি না। সেখানে পাঁচ দিনের বেশি সময় বন্দর বন্ধ রয়েছে। এতে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা আন্দোলনকারীদের কঠোর হাতে দমন করছে। ব্যবস্থা নিচ্ছে কিন্তু আমাদের কনটেইনার তো নড়ছে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে বাধ্য।
এ বিষয়ে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠনের (বিকডা) সেক্রেটারি রুহুল আমিন শিকদার জানান, অফডক কর্তৃপক্ষ আমদানি, রপ্তানি ও খালি—তিন ধরনের কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। এর মধ্যে গত বুধবার ১৮টি ডিপোয় রপ্তানিমুখী কনটেইনারের সংখ্যা রয়েছে ১০ হাজার ৮১০টি। আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার আছে সাত হাজার ৯০০টি আর জাহাজিকীকরণের জন্য অপেক্ষমাণ খালি কনটেইনারের সংখ্যা আছে ৫২ হাজার টিইইউএস। সবকটি ক্যাটাগরিতে ধারণক্ষমতার খুব কাছাকাছি রয়েছে। যেহেতু কাজ হচ্ছে না, তাই এখন এ সংখ্যা স্থিতিশীল থাকবে। কাজ শুরু হলে যে চাপ বাড়বে, তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে যে চুক্তির আশঙ্কায় গত পাঁচদিন ধরে বন্দর অচল করে রাখা হয়েছে, সে চুক্তি এখনো হয়নি। গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পিপিপি কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি স্বাক্ষরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা আর হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ওমর ফারুক জানান, চুক্তি নিয়ে তারা কিছু বলতে পারবেন না। পুরো বিষয়টি সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। সরকার যেভাবে বলছে, বন্দর কর্তৃপক্ষ সেভাবে কাজ করবে।
তবে বন্দরসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে কয়েকটি শর্তে আপত্তি জানিয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এর বাইরে চলমান আন্দোলনের কারণে সরকারও কিছুটা ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছে।