প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গত মৌসুমে দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তবে চলতি মৌসুমের শুরুতেই আগাম বৃষ্টিপাত হওয়ায় চা শিল্পে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বাগান মালিক, চা নিলামকারী ও বোর্ড সংশ্লিষ্টরা জানান, অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে দেশে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন হতে পারে।
চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দুই লাখ ৫৮ হাজার কেজি বেশি চা উৎপাদন হয়েছে। গত ২৭ এপ্রিল মৌসুমের প্রথম চা নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে ওঠা চায়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিক্রি হয়েছে।
চা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, এপ্রিলের শেষ দিক থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, পঞ্চগড় ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে ভালো বৃষ্টিপাত হওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। গত বছর এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি। তবে সে বছর wযউৎপাদন হয়েছিল ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮০ লাখ ৭০ হাজার কেজি কম উৎপাদন হয়। এর আগে ২০২৪ সালে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ৮০ লাখ কেজি। তবে উৎপাদন হয়েছিল ৯ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার কেজি। টানা দুই বছর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় চা শিল্পে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে মাত্র ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা। যদিও ২০২৪ সালে ১৯টি দেশে রপ্তানি হয়েছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার কেজি। বর্তমানে দেশে চায়ের বার্ষিক চাহিদা ১০ কোটি কেজির বেশি। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খাচ্ছে শিল্পটি।
জেলাভিত্তিক উৎপাদন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মৌলভীবাজারে চার কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার কেজি, পঞ্চগড়ে দুই কোটি দুই লাখ ৩০ হাজার, হবিগঞ্জে এক কোটি ৫১ লাখ ২০ হাজার, চট্টগ্রামে এক কোটি চার লাখ ৩০ হাজার এবং সিলেটে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এছাড়া বান্দরবান ও রাঙামাটি মিলিয়ে উৎপাদন হয়েছে ৫০ হাজার কেজি।
চা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি মৌসুমে দেশের তিনটি নিলাম কেন্দ্রে মোট নিলাম পরিচালনা করা হবে ১১৯টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে ৪৭টি করে এবং পঞ্চগড়ে ২৫টি। বর্তমান দেশে চা বাগান রয়েছে ১৭২টি এবং কারখানা রয়েছে ১৬২টি। এর মধ্যে তিনটি বাগান সরকারি। এছাড়া চট্টগ্রামে বাগান আছে ২২টি, বান্দরবানে দুটি, খাগড়াছড়িতে একটি, পঞ্চগড়ে ১১টি, রাঙামাটিতে দুটি, ঠাকুরগাঁওয়ে একটি, সিলেটে ১৯টি, হবিগঞ্জে ২৫টি ও মৌলভীবাজারে ৯১টি।
এদিকে গত ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ টি অকশন সেন্টারে চলতি মৌসুমের প্রথম নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নিবন্ধিত ব্লেন্ডার, ট্রেডার ও সাতটি ব্রোকার হাউসের প্রায় ২০০ জন অংশ নেন। নিলামে ওঠা চায়ের ৯৫ শতাংশ বিক্রি হয়। এছাড়া ৪ মে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নিলামে ২৪ হাজার ১৫৬ বস্তা চা ওঠে, যার ৯০ শতাংশ বিক্রি হয়েছে। আগামী সোমবার অনুষ্ঠেয় তৃতীয় নিলামে ৩৩ হাজার ২৩৬ বস্তা চা তোলা হবে।
চলতি বছর সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের চায়ের সর্বোচ্চ দর কেজিপ্রতি ২৪৫ টাকা এবং পঞ্চগড় অঞ্চলের জন্য ১৭০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রতি সোমবার চা নিলাম অনুষ্ঠিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধি না পেলে ভবিষ্যতে দেশকে চা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়তে হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অসংগতি শিল্পটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাছাড়া গত মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও বৃষ্টিপাতের কারণে এবার ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি বাড়বে উৎপাদনও। বাংলাদেশ চা বোর্ডও উৎপাদন ও চায়ের মান বাড়াতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে। বর্তমানে বিদেশে রপ্তানি দূরের কথা, অভ্যন্তরীণ চাহিদাও মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে দেশের চা শিল্প।
উৎপাদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে দেশের চা খাত। অর্জিত হচ্ছে না লক্ষ্যমাত্রা, মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দামও। গত মৌসুমের শেষদিকে কম উৎপাদনের ফলে চা শূন্যতা দেখা দিলে চার-চারটি নিলাম বাতিল করতে হয় চা বোর্ডকে। এতে অনেক বাগান মালিক চা বাগানে রিসোর্ট, সোলার্স স্থাপনাসহ টি ইকো ট্যুরিজম গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সেসব প্রস্তাবে অনুমতি দিচ্ছে না চা বোর্ড।
প্রোডিউজ ব্রোকার্সের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মায়িশা রহমান বলেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে চায়ের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং উত্তরবঙ্গের সমতলে চা চাষের বৈপ্লবিক বিস্তৃতি এ শিল্পে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। উত্তরবঙ্গের ‘বট লিফ ফ্যাক্টরি’ বা ক্ষুদ্র চাষিদের কাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করে চা তৈরির পদ্ধতি এ শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলা করা গেলে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি চা উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
ইস্পাহানী টি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার ও টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান (টিটিএবি) শাহ মঈনুদ্দিন হাসান বলেন, আগাম বৃষ্টি হওয়াতে আমরা ফলনের ব্যাপারে আশাবাদী। চাহিদা ও সরবরাহ কম হওয়ায় ভালো দাম মিলছে। তবে দেশে অবৈধ পথে চা বিক্রি হওয়ায় আমরা ক্ষতির মুখে পড়ছি। যারা সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করছি তারা ভালো দামে চা বিক্রি করতে পারছি না।
সরকারি পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, যারা বাগান থেকে কোন অকশন ছাড়াই চা কিনছে তারা বেশি লাভবান হচ্ছে। কেননা তারা কম দামে বাজারে চা পাতা ছাঢ়তে পারছে। এতে একটি অসম প্রতিযোগিতা চলছে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যারা সৎ পথে ব্যবসা করছে তাদের যেন গ্রোথ ঠিক থাকে। তা না হলে তারা ব্যবসা থেকে হারিয়ে যাবে। তখন দিনশেষে দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের দেশের চায়ের দাম বেশি। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাগানের আয়তন অনুসারে উৎপাদন অনেক কম হওয়ায় সামঞ্জস্য হচ্ছে না। তবে বৈচিত্র্যময় চায়ের বাজারে আমরা প্রতিযোগিতা করছি। আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি চা আমরা বিদেশে রপ্তানি করছি।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইন বলেন, এ বছর আগাম বৃষ্টি ভালো ফলন এনে দেবে। গত বছর আগাম বৃষ্টি না থাকায় এবং নানা প্রতিকূল বিপর্যয়ের কারণে চায়ের খারাপ হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, কঠোরভাবে অকশন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সরকারের ১৭ শতাংশ রাজস্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া আমরা দেশের প্রতিটি চা কারখানা পরিদর্শন করছি। কেমিক্যাল ব্যবহারের পরিবর্তে জৈব সার ও ভার্মিকম্পোস্ট সারের ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। যাকে আমরা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নামকরণ করেছি।
চা বোর্ডের এই সদস্য জানান, সঠিক প্রক্রিয়ায় চা বর্জ্য ধ্বংস করা হচ্ছে। দেশের চায়ের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করতে মনোযোগী হচ্ছে বাংলাদেশ। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে আবাদ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চায়ের স্বাদ, ঘ্রাণ ও মান ঠিক রাখতে প্রাকৃতিক সার প্রয়োগে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। তবে মজুরিসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে বাগান মালিকরা।