চট্টগ্রাম-৬-এ বিএনপির দুই প্রার্থী
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপিদলীয় মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে দুই নেতাকে। তারা হলেন—দলের ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার। ইতোমধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে দুজনের মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে সম্পদ, মামলা ও ঋণের তথ্য নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনি হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সম্পদের দিক থেকে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন গোলাম আকবর খোন্দকার। গোলাম আকবরের মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৬ কোটি টাকা, আর গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর মোট সম্পদ প্রায় ২৬ কোটি টাকা। তবে ঋণের ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো—গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঋণের পরিমাণ গোলাম আকবরের তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি।
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী মিনা পারভীন কাদের চৌধুরীর সম্পদের পরিমাণ ১৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে গোলাম আকবর খোন্দকারের স্ত্রী রিজিয়া খোন্দকারের সম্পদও প্রায় একই পরিমাণের। মামলার ক্ষেত্রে গোলাম আকবর খোন্দকারের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। তবে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে এখনো পাঁচটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
হলফনামা অনুযায়ী, গোলাম আকবর খোন্দকারের প্রধান আয়ের উৎস পরামর্শ প্রদান, যা থেকে তিনি বছরে প্রায় ১১ লাখ টাকা আয় করেন। এছাড়া শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত থেকে তার বার্ষিক আয় প্রায় ছয় লাখ টাকা। তার হাতে নগদ অর্থ রয়েছে এক কোটি ২২ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর হাতে রয়েছে এক লাখ ৮২ হাজার টাকা।
অস্থাবর সম্পদের হিসাবে গোলাম আকবরের বন্ড, সঞ্চয়পত্র ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের মূল্য এক কোটি ৯ লাখ টাকা। এছাড়া ৩০ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি, ১৭ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং আসবাবপত্রসহ অন্যান্য অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। তার স্ত্রী রিজিয়া আকবর খোন্দকারের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে তাদের মোট অস্থাবর সম্পদ দাঁড়ায় প্রায় তিন কোটি ২৭ লাখ টাকা।
স্থাবর সম্পদের হিসাবে গোলাম আকবরের কক্সবাজার, ঢাকা ও কেরানীগঞ্জে একাধিক অকৃষি জমি রয়েছে, যার মোট মূল্য পাঁচ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে সাত লাখ টাকা মূল্যের অকৃষি জমি। এছাড়া ঢাকার বনানী ও গুলশানে তার বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে, যার মূল্য এক কোটি ২১ লাখ টাকা। অন্যদিকে তার স্ত্রীর নামে চট্টগ্রামে একটি ভবন রয়েছে, যার মূল্য ৮৩ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে গোলাম আকবর ও তার স্ত্রীর মোট স্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৯ কোটি টাকা। অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ মিলিয়ে গোলাম আকবরের মোট সম্পদ ৩৬ কোটি টাকা এবং তার স্ত্রীর প্রায় ১৭ কোটি টাকা।
গোলাম আকবর নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো ঋণ নেই বলে উল্লেখ করলেও তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রিজেন্ট ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নামে ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ২৭ কোটি ৮০ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে। এ ঋণের বিষয়ে চলতি বছরের অক্টোবর থেকে সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ কার্যকর আছে। আয়কর নথি অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তিনি সম্পদ দেখিয়েছেন ৩৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, তার স্ত্রী সাত কোটি এবং দুই ছেলে ১০ কোটির বেশি। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই; আগে থাকা সাতটি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন।
অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৬ কোটি টাকা। তার স্ত্রী মিনা পারভীন কাদের চৌধুরীর সম্পদ রয়েছে প্রায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আয় বিবরণীতে দেখা যায়, তিনি কৃষি বা বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট থেকে কোনো ভাড়া পান না, ব্যবসা পরিচালনা সূত্রে পরিচালক ভাতা হিসেবে বছরে ৩১ লাখ টাকা পান।
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে গিয়াস কাদের চৌধুরীর নগদ অর্থ এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর নগদ রয়েছে তিন কোটি টাকা। তার দুটি ব্যাংক হিসাবে জমা আছে মাত্র ২৮ হাজার টাকা, আর স্ত্রীর হিসাবে রয়েছে ৩০ হাজার টাকা। গিয়াস কাদেরের বন্ড ও শেয়ার রয়েছে ১৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর একই খাতে প্রায় চার কোটি টাকা। ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাবপত্রে তার সম্পদ প্রায় সাত লাখ টাকা আর তার স্ত্রীর রয়েছে প্রায় ৬৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে গিয়াস কাদেরের অস্থাবর সম্পদ ২১ কোটি ৩১ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর সাত কোটি ৫০ লাখ টাকা।
স্থাবর সম্পদের হিসাবে গিয়াস কাদেরের নামে রয়েছে চার কোটি ৪৮ লাখ টাকার সম্পদ। তার নামে কোনো অ্যাপার্টমেন্ট না থাকলেও স্ত্রীর নামে বনানী ও গুলশানে দুটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে, যার মূল্য ৯ কোটি টাকা। ফলে তার মোট সম্পদ দাঁড়ায় প্রায় ২৬ কোটি টাকা।
ঋণের ক্ষেত্রে গিয়াস কাদেরের নামে কোনো ঋণ না থাকলেও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে আট কোটি ২১ লাখ টাকা এবং তিন সন্তানের নামে প্রায় ১৬ কোটি টাকার হোম লোন। এছাড়া পাঁচটি ব্যাংক থেকে নেওয়া তার ব্যবসায়িক ঋণের পরিমাণ ৬৭৯ কোটি টাকা, যা বর্তমানে হাইকোর্টে স্থগিত রয়েছে। এ ঋণের পরিমাণ গোলাম আকবর খোন্দকারের তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে গিয়াস কাদের তার সম্পদ দেখিয়েছেন ১৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা, তার স্ত্রী সাড়ে ছয় কোটি এবং তিন সন্তান ৩৬ কোটি টাকা। তার বিরুদ্ধে একসময় ২২টি মামলা থাকলেও বর্তমানে পাঁচটি বিচারাধীন রয়েছে।