চট্টগ্রামে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কার্যালয়ে প্রবাসীর স্ত্রীকে রাতভর আটকে রেখে নির্যাতন, শ্লীলতাহানি ও পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দিয়ে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) মহিউদ্দীন রাজু।
ভুক্তভোগী লুৎফুর নেছা অভিযোগ করেছেন, তাকে বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে প্রায় ১৬ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এরপর একটি অঙ্গীকারনামায় জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে প্রাণ ও পরিবারের নিরাপত্তার ভয়ে তিনি এবং তার প্রবাসী স্বামী ১ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ লেনদেনের স্ক্রিনশট, অডিও রেকর্ড এবং আদালতে দাখিল করা মামলার নথি পর্যালোচনা করে টাকা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় গত ১ জুন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে ভুক্তভোগী মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেয়। বাদীপক্ষের আইনজীবী আবু বাকর সিদ্দিক বলেন, পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, লুৎফুর নেছার স্বামী ফজলুল কাদের বাদশা দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোবাইল এক্সেসরিজ ব্যবসা করেন। ২০২৪ সালে সেখানে তার পরিচয় হয় ফটিকছড়ির বাসিন্দা নাজমুল হাসান ওরফে নাহিদের সঙ্গে। পরে দুজন যৌথভাবে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু ব্যবসায় লোকসান হওয়ার পর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে নাহিদ দেশে ফিরে আসেন। এরপর তিনি কাদেরের কাছে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন।
স্বামী বিদেশে থাকায় নাহিদ সরাসরি লুৎফুর নেছার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। একপর্যায়ে তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নগরের মুরাদপুর এলাকার নিজ বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি লুৎফুর নেছাকে উঠিয়ে নিয়ে যান। তাদের মধ্যে নাহিদ, ডিবির এসআই মহিউদ্দীন রাজু, বরখাস্ত সাবেক ডিবি কর্মকর্তা দীপঙ্কর এবং আরো দুজন ছিলেন। লুৎফুর নেছার দাবি, কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা লিখিত নোটিস ছাড়াই তাকে জোরপূর্বক একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।
সরকারি কার্যালয়ে রাতভর
এরপর নগরের মনসুরাবাদে ডিবি উত্তর বিভাগের কার্যালয়ে লুৎফুর নেছারকে রাতভর আটকে রাখা হয়। তার শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানি করা হয় এবং দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, টাকা না দিলে তার মেয়ে, জামাই, বাবা ও ভাইকে মাদক মামলায় ফাঁসানো হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তাদের হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকিও দেওয়া হয়।
লুৎফুর নেছা আমার দেশকে বলেন, এ ঘটনার স্ক্রিনশট এবং অডিও সংরক্ষিত আছে। ডিবি নিজের অফিস থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে টাকা নিয়েছে। এখন আমি কোথায় যাব? মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে পরদিন ২৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা পর্যন্ত তাকে সেখানে রাখা হয়।
মামলায় আরো বলা হয়, একপর্যায়ে ভয়ে টাকা দিতে সম্মত হলে ডিবি কার্যালয়ের একটি কম্পিউটারে তিনটি ১০০ টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা প্রস্তুত করা হয়। ওই দলিলে উল্লেখ ছিল, ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ না করলে এসআই মহিউদ্দীন রাজু যে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন এবং তাতে লুৎফুর নেছার কোনো আপত্তি থাকবে না। ভুক্তভোগীর দাবি, জোরপূর্বক তার কাছ থেকে ওই নথিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
এক কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ
ডিবি কার্যালয় থেকে ফিরে পরিবারটি আতঙ্কে পড়ে যায়। লুৎফুর নেছা জানান, স্বর্ণালংকার বিক্রি, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার এবং বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তারা এক কোটি ১০ লাখ টাকা জোগাড় করেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি তিনি আবার ডিবি কার্যালয়ে যান এবং সেখানে অভিযুক্তদের কাছে ওই টাকা হস্তান্তর করেন।
আমার দেশ অর্থ লেনদেন-সংক্রান্ত স্ক্রিনশট পর্যালোচনা করেছে। সেখানে অভিযুক্ত এসআই মহিউদ্দীন রাজুর কাছে ছয় লাখ টাকা পরিশোধের তথ্য দেখা যায়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, এক কোটি ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পরও বাকি এক কোটি ৪০ লাখ টাকা মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের জন্য চাপ অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে নানা ধরনের হুমকিও অব্যাহত ছিল বলে দাবি করেন লুৎফুর নেছা।
তিনি জানান, এ ঘটনায় অভিযোগ করতে প্রথমে পাঁচলাইশ থানায় যান। তবে সেখানে মামলা গ্রহণ না করে তাকে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আইনজীবীরা বলছেন, কোনো ফৌজদারি অভিযোগে পুলিশ মামলা না নিলে সেটিও প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে অভিযোগের তীর যখন পুলিশের একজন সদস্যের দিকে থাকে।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই মহিউদ্দীন রাজু। তিনি আমার দেশকে বলেন, মো. হাসান নামে একজন আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। তার দাবি ছিল, প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ টাকার স্বর্ণ-সংশ্লিষ্ট একটি কেমিক্যালের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। আমি দুপক্ষের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা করেছি। টাকা নেওয়া বা নির্যাতনের অভিযোগ সঠিক নয়।
তবে এ বিষয়ে মো. হাসানের বক্তব্যে বেশকিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, স্বর্ণগুলো আমার ছিল না। এগুলো ছিল আমার খালাতো ভাই নাহিদের। এর বেশি আর বলতে পারব না। তবে চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে নাহিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যদি কাউকে আইনবহির্ভূতভাবে আটকে রাখেন, অর্থ আদায় করেন কিংবা পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দেন, তাহলে সেটি শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান শওকত আলী বলেন, আইনের বাইরে গিয়ে কেউ কাউকে তুলে আনতে পারে না। আদালতে একটি মামলা হয়েছে বলে জেনেছি। আদালত যেহেতু পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দোষী সাব্যস্ত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।