চট্টগ্রামে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রম অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেছে। বড় ধরনের কয়েকটি অনুসন্ধান চলমান থাকলেও নতুন মামলা দায়েরের হার কমেছে। আলোচিত অনেক অনুসন্ধানের অগ্রগতিও দৃশ্যমান নয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে চট্টগ্রামে দুদকের মামলার কার্যক্রম কী হঠাৎ থমকে গেছে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামে দুদকের কার্যক্রমে নতুন গতি দেখা যায়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী-এমপি, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একের পর এক অনুসন্ধান, অভিযান ও মামলা শুরু হয়। চট্টগ্রামের সমন্বিত জেলা কার্যালয় হয়ে ওঠে আলোচিত দুর্নীতি মামলার কেন্দ্রবিন্দু।
এছাড়া সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা এবং ব্যাংক খাতের অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ জমা পড়তে থাকে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক চট্টগ্রামে একাধিক অনুসন্ধান শুরু করে। বিশেষ করে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি, রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন প্রকল্প, সিডিএর (চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) অনুমোদন বাণিজ্য এবং ব্যাংকিং খাতের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়।
গত বছর চট্টগ্রামে দুদকের সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলোর মধ্যে ছিল সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রায় ১১৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের মামলা। মামলায় অভিযোগ করা হয়, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন। একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
গত বছরের শেষ দিকে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) বিভিন্ন শাখা থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আটটি মামলা করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, দিনমজুর, কৃষক, অটোরিকশা চালক ও সাধারণ মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভুয়া ব্যবসায়ী সাজিয়ে ঋণ তুলে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। একই ধরনের আরেক ঘটনায় ইউসিবির সাতটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরো সাতটি মামলা করে দুদক।
মামলার পাশাপাশি ওই বছরে চট্টগ্রামে দুদকের কয়েকটি অভিযান ব্যাপক আলোচনায় আসে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ঘুষ গ্রহণের সময় এক রাজস্ব কর্মকর্তাকে হাতেনাতে আটক করে দুদক। অভিযোগ ছিল, আমদানিকারকের পণ্য ছাড় করাতে ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। এছাড়া ভবনের নকশা অনুমোদনের নামে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে সিডিএতে অভিযান চালায় দুদক। অভিযানে অনিয়ম ও হয়রানির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়।
মামলার গতি কমেছে
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চট্টগ্রামে দুদকের পক্ষ থেকে কয়েকটি মামলা দায়ের হলেও সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। জানুয়ারিতে ইউসিবি ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে সাতটি নতুন মামলা করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে একটি ব্যাংক জালিয়াতি মামলায় তদন্ত এগোয় এবং জুনে সেই মামলার একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী প্রায় সাত কোটি ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কিন্তু এসব বিচ্ছিন্ন মামলার বাইরে বড় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দুর্নীতির নতুন কোনো আলোচিত মামলা জুন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি।
দুদক সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে এখনো অনেক অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। তবে অনুসন্ধান শেষ হয়ে মামলায় রূপ নেওয়ার হার কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিদেশে সম্পদের তথ্য যাচাই এবং আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের কারণে সময় লাগছে। তবে আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে দুদকের দৃশ্যমান কার্যক্রম কমে গেছে। বিশেষ করে আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানগুলোর অগ্রগতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ধরে রাখতে হলে অনুসন্ধান দ্রুত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে চার্জশিট ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে।
তাদের মতে, কেবল অনুসন্ধান শুরু করাই যথেষ্ট নয়; মামলা, চার্জশিট ও আদালতে দণ্ড নিশ্চিত করতে না পারলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আখতার কবির চৌধুরী বলেন, দুদকের কাজ শুধু অনুসন্ধান শুরু করা নয়, অনুসন্ধানকে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়া। ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামে দুদকের কার্যক্রমে যে গতি দেখা গিয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে সেই দৃশ্যমান তৎপরতা অনেকটাই কমে গেছে। বড় বড় দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হলেও সেগুলোর অনেকগুলোর অগ্রগতি জনগণের সামনে স্পষ্ট নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আস্থা তৈরি করতে হলে দুদককে আরো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের ভিত্তিতে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুদকের পিপি মোকাররম হোসেন বলেন, গত প্রায় তিন মাস ধরে দুদকে পূর্ণাঙ্গ কমিশন নেই। ফলে নতুন মামলা অনুমোদনের ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে। দুদকের মামলার ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কমিশন না থাকায় অনেক প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ রয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করলে এসব বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং মামলা কার্যক্রমেও গতি ফিরে আসবে বলে আমরা আশা করছি।