চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকার রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল সবার জন্য উন্মুক্ত করা হলেও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে এখনো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বহির্বিভাগ ও অন্তঃবিভাগ চালু থাকলেও জনবল সংকট, সীমিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় প্রত্যাশিত মানের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়োগ ও সরঞ্জাম সংযোজনের কাজ শেষ হলে সেবার পরিধি আরো বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছর রেলপথ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের পর রেলওয়ে হাসপাতালগুলো যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের ‘রেলওয়ে নিয়ন্ত্রিত বক্ষব্যাধি হাসপাতাল’-এর নাম পরিবর্তন করে রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল রাখা হয় এবং শুধু রেলওয়ে যক্ষ্মা চিকিৎসার পরিবর্তে সাধারণ রোগীদের জন্য হাসপাতালটি উন্মুক্ত করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বহির্বিভাগে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, চর্মরোগ, যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে চিকিৎসা পাচ্ছেন রোগীরা। বহির্বিভাগ চালুর পর রোগী বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৩৫০-৩৬০ জন বহির্বিভাগে এবং জরুরি বিভাগে প্রায় ১০ রোগী সেবা নিচ্ছেন। ৮৩ শয্যার অন্তঃবিভাগও প্রায় সব সময় রোগীতে পূর্ণ থাকে। রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধও দেওয়া হচ্ছে।
এনায়েত বাজারের আব্দুল কুদ্দুস (৪০) জানান, পা ভেঙে যাওয়ার পর এখানকার চিকিৎসায় তিনি প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন। পাহাড়তলীর আব্দুর রহমান (৬৫) বলেন, ডায়াবেটিসের কারণে পায়ে সমস্যা নিয়ে কদিন ধরে হাসপাতালে আসা-যাওয়া করছি। টিকিট কেটে ডাক্তার দেখাতে পারলেও সিরিয়াল পেতে দেরি হয়, আবার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগও সীমিত। রোগীর চাপ বেশি এবং ডাক্তার ও জনবল ঘাটতির কারণে সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছি না।
হাসপাতালের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিছু চিকিৎসক সময়মতো হাসপাতালে উপস্থিত হন না। কেউ দেরিতে আসেন, কেউ কেউ আগেই চলে যান; আবার কেউ দীর্ঘ ছুটিতে থাকেন। এতে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অনুমোদিত চিকিৎসকের পদের সংখ্যা ৪০ হলেও কর্মরত মাত্র ১৩ জন। নার্সের অনুমোদিত ১৬ পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র পাঁচজন এবং ৩৪ ফার্মাসিস্ট পদের বিপরীতে কর্মরত ১৪ জন। এছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির ৮০ পদের মধ্যে কর্মরত ৩৫, তৃতীয় শ্রেণির ৮৭ পদের মধ্যে কর্মরত ৩৭, চতুর্থ শ্রেণির ৭৫৯ পদের মধ্যে কর্মরত ৫৭৪ জন।
বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. তাহামিনা ইয়াসমিন বলেন, অর্থসংকটের কারণে বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য এখনো পূর্ণাঙ্গ প্যাথলজি সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে একজন ডায়াবেটিস ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দায়িত্ব পালন করছেন। বাজেট অনুমোদন হলে দ্রুত প্যাথলজি ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে অন্তঃবিভাগে অর্থোপেডিক্স, মেডিসিন, গাইনি, কার্ডিওলজি এবং চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে সার্জারি, ডেন্টাল, নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিভাগ চালুর পাশাপাশি আধুনিক ল্যাবরেটরি ও রেডিওলজি সুবিধাও যুক্ত করা হচ্ছে।
হাসপাতালের অতিরিক্ত প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. তুহিন বিনতে হালিম বলেন, আগে হাসপাতালটি মূলত রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সীমিত থাকলেও বর্তমানে এটি সাধারণ মানুষের জন্যও উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রেষণে আসা চিকিৎসকসহ বর্তমানে ১৯ চিকিৎসক এবং ৯ জন নার্স হাসপাতালটিতে কর্মরত। তবে প্রেষণে আসা তিনজন চিকিৎসক ইতোমধ্যে চলে গেছেন। নার্স সংকটও রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতির কারণে বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রেলওয়ে হাসপাতালটি এখন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ প্রেষণে সেখানে চিকিৎসক ও নার্সও নিয়োগ দিয়েছে।
তিনি বলেন, সিআরবি এলাকায় জনসমাগম তুলনামূলকভাবে কম এবং নিয়মিত গণপরিবহন না থাকায় অনেক রোগী হাসপাতালে আসতে আগ্রহী হন না। ফলে চিকিৎসকদের কর্মঘণ্টার পুরোপুরি ব্যবহারও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ ইতিহাসের ধারক চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের সেবা পুনরায় চালু হলেও প্রয়োজনীয় জনবল, বাজেট ও যাতায়াত সুবিধার অভাবে এখনো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
ব্রিটিশ আমলে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর অংশ হিসেবে রেল শ্রমিক-কর্মচারীদের চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতাল ব্যবস্থার সূচনা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনে হাসপাতালটির কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলেও সময়ের সঙ্গে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটে এর সক্ষমতা কমে যায়। বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতালটি উন্মুক্ত হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও বরাদ্দ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত মানের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।