চট্টগ্রাম বন্দরে নজিরবিহীন কাণ্ড
চট্টগ্রাম বন্দরের মোট ৫৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সম্মানীর নামে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড। এর মধ্যে ২৭ কর্মকর্তাকে পাঁচ মাসের বেতনের সমান এবং ২৯ কর্মচারীকে তিন মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বন্দরের তহবিল থেকে সম্মানী হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ১৪ ডিসেম্বর বোর্ড সভায় নজিরবিহীন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ১২ জানুয়ারি তা দপ্তরাদেশ হিসেবে প্রকাশ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে বুধবার রাতে বিষয়টি জানাজানি হলে শুরু হয় তোলপাড়। সম্মানী পাওয়া এই কর্মকর্তারা ‘ইস্টাবলিশমেন্ট অ্যান্ড অপারেশন অব লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল অ্যাট চিটাগং পোর্ট দ্রো পিপিপি মডেল’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক প্রশাসনের দপ্তর থেকে জারি হওয়া ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চবকের ৫৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে কোর কমিটি, টেকনিক্যাল টিম, প্রজেক্ট ডেলিভারি টিম, চবক বোর্ড সদস্য, পরিচালক প্রশাসন, সচিবসহ ২৭ জনকে পাঁচ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ এবং অবশিষ্ট ২৯ সহায়তাকারীকে তিন মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সম্মানী হিসেবে প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দপ্তরাদেশ জারি করা হলো। চিঠির নিচে ৫৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামের তালিকা ও পদবি রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যন, চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব, তিনজন বোর্ড মেম্বার, সচিব ও পরিচালক প্রশাসনের মতো শীর্ষ কর্মকর্তাদের নামও রয়েছে।
বন্দর সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলে পরিচালনার জন্য এপি মোলার মায়ের্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে গত ১৭ নভেম্বর। তখন থেকেই তড়িঘড়ি করে করা এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বন্দরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে। কারণ চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত বন্দরের এই পিপিপি প্রকল্পের সরকারি শর্তগুলোই পূরণ হয়নি। অথচ পিপিপি আইনে শর্ত সাপেক্ষ অনুমোদন কখনোই চূড়ান্ত অনুমোদন নয়। নিয়ম অনুযায়ী শর্ত পূরণের পর (প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে সুপারিশ করা শর্তগুলো পরিপূর্ণ করে) পুনরায় পিপিপি কমিটি ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের এই ধাপ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হওয়ায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের ভেতরে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই চুক্তি কেন এবং কোন ভিত্তিতে করা হলো।
এই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারী বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্মানী হিসেবে পাওয়ার জন্য মনোনীত হওয়ায় চুক্তির অসংগতি এবং দেশের স্বার্থ ঠিকমতো রক্ষিত হয়েছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ কয়েক বছর আগে লালদিয়া চর থেকে কয়েকশ মিটার দূরে অবস্থিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল তৈরি করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। জেটিসহ ভৌত অবকাঠামোর জন্য খরচ হয় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আর ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কিনলেই টার্মিনালটি পুরোদমে অপারেশনে যেত। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকার সম্পূর্ণ তৈরি করা টার্মিনালটি সৌদি প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়েকে অপারেশনের জন্য নিয়োগ দেয়। লালদিয়ার চর টার্মিনাল অবশ্য এপি মোলার মায়ের্স্ক নিজস্ব টাকায় তৈরি করে নেবে। কিন্তু চুক্তিতে এখানে তাদের সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এতে ভিনদেশি প্রতিষ্ঠানটি চুক্তিতে বেশি সুবিধা পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে বন্দরসংশ্লিষ্টদের। এ ধরনের একটি বিতর্কিত চুক্তি তৈরির কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন করে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি বিতর্কের ঝড় তুলেছে বন্দরের অভ্যন্তরে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জাতীয় পর্ষদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার মজুমদার জানান, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কীভাবে আর্থিক সুবিধা ভোগ করবেন, তার একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। বন্দর যে প্রক্রিয়ায় একটি চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, তা চাকরিবিধির পরিপন্থি। তার চেয়েও অবাক করা বিষয় হলো, যে বোর্ড সভায় এই সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে সেই বোর্ড সদস্যরাও এই সুবিধা পাচ্ছেন। এতে মনে হচ্ছে নিজেরা আর্থিক সুবিধা নিতেই নিচের লেভেলের কিছু কর্মচারীকেও অনৈতিক সুবিধার ভাগীদার বানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটা অংশ দিন-রাত পরিশ্রম করে নির্ধারিত সময়ের আগে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করেছে। এজন্য কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হয়ে বিশেষ একটি সম্মানী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন সম্মানীর বিধান নিয়মের মধ্যেই রয়েছে। এর আগেই বিশেষ সময়ে বিশেষ কাজের জন্য সংশ্লিষ্টদের বিশেষ সম্মানী দেওয়ার নজির বন্দরে রয়েছে। এখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী জানান, একজন সরকারি কর্মকর্তার কোনো কর্মঘণ্টা নেই, সে তার দায়িত্ববোধ থেকেই অতিরিক্ত সময় কাজ করেন। কর্মচারীরা যদি অফিস টাইমের বাইরে কাজ করেন, সে জন্য সরকারি নিয়মেই ওভারটাইম পাবেন। কোনো বিশেষ কাজ বেশি সময় ধরে করার জন্য অতিরিক্ত সম্মানি নেওয়ার কোনো বিধান নেই। এছাড়া বিদেশি অপারেটর নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে বিতর্ক আছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা উদাসীন থাকেন। কারণ এখানে আন্ডারটেবিল ডিলিংস হয়। সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন চুক্তির জন্য প্রণোদনা দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন।