জাতীয় মাছ ইলিশ উৎপাদনে ধস নেমেছে। নদীতে জেলের জালে, আড়তে এবং বাজারে ইলিশের সরবরাহ প্রতি বছরই কমছে। আর উৎপাদনে ধস নামার কারণে হাটবাজারে এখন আর আগের মতো ইলিশ মিলছে না। কিন্তু বেড়েই চলছে ইলিশের দাম। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ ইলিশের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। নদীতে চর ও ডুবোচর জেগে ওঠায় ইলিশের চলাচলের পথ সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় প্রজননেও ব্যাঘাত ঘটছে।
জানা গেছে, সরকারি হিসাবে দেখানো হচ্ছে, দেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন। মৎস্য সপ্তাহের বিভিন্ন অনুষ্ঠান কিংবা সরকারি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্যের গালগল্প। জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারিভাবে কাগজে-কলমে উৎপাদন বাড়লেও বাস্তবে নদীতে কমছে ইলিশ। ফলে সরকারি তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য।
একসময় পদ্মা-মেঘনার বুকজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ত। এখন সেই দৃশ্য দেখা যায় না। জেলেরা বলছেন, এখন আর আগের মতো ইলিশ পাওয়া যায় না। তাদের দাবি, আগে কয়েক ঘণ্টা জাল ফেললেই নৌকাভর্তি ইলিশ পাওয়া যেত। এখন পুরো রাত নদীতে থেকেও আশানুরূপ মাছ মিলছে না। তারা মনে করেন, বাস্তবে উৎপাদনের চেয়ে সরকারি হিসাবে ইলিশ বেশি দেখানো হচ্ছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার টন। এর আগের বছর ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন দেখানো হয় পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৬৬ হাজার টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার টন এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টন।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল পাঁচ লাখ ৩২ হাজার টন এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার টন। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ টনে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর এটিই সবচেয়ে কম উৎপাদনের বছর বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু এ পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জেলেরা। তাদের ভাষ্য, পাঁচ বছর ধরে নদীতে আগের মতো ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। মাছ ধরতে দীর্ঘ সময় নদীতে অবস্থান করেও অনেক সময় খরচ উঠছে না।
চাঁদপুরের একাধিক জেলে জানান, আগে কয়েক ঘণ্টা জাল ফেললেই নৌকাভর্তি ইলিশ পাওয়া যেত। এখন সারা রাত নদীতে থেকেও আশানুরূপ মাছ মিলছে না। তারা মনে করেন, বাস্তবে উৎপাদনের চেয়ে সরকারি হিসাবে ইলিশ বেশি দেখানো হচ্ছে। কেননা ইলিশের উৎপাদন বাড়লে মাছের আকাল থাকার কথা নয়।
‘দিন-রাত জাল ফেলেও এখন আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। বরং নদীতে মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। কয়েক বছর আগেও একটি জালে যে পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ত, বর্তমানে তার তিন ভাগের একভাগও উঠে না। জ্বালানি, শ্রমিক ও নৌকার খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে মাছ মিলছে না বলে জেলেদের সংসারে দীনতা বাড়ছে। অধিকাংশ জেলে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ।
চাঁদপুর মাছঘাটে আড়তদার নবীর হোসেন জানান, জাটকা রক্ষা অভিযান শেষ হওয়ার পরও ঘাটে ইলিশের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। বর্তমানে ইলিশের চরম সংকট চলছে। আগে মৌসুম ছাড়া স্বাভাবিক সময়েই প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচশ মণ ইলিশ সরবরাহ হতো, কিন্তু এখন সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী অল্প কিছু ইলিশ নিয়ে আড়তে বসে থাকেন। সরবরাহ কম থাকায় দামও আকাশছোঁয়া।
বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকায়। ছোট আকারের ইলিশের দাম দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে। অতিরিক্ত দামের কারণে অনেক ক্রেতাই এখন ইলিশ কিনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল বারী জমাদার মানিক জানান, ২০২০ সালে প্রতিদিন যেখানে গড়ে এক হাজার থেকে দেড় হাজার মণ ইলিশ সরবরাহ হতো, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র দুই থেকে তিনশ মণে। এমনকি ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে পরিচিত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরেও এখন পাঁচশ থেকে সাতশ মণের বেশি ইলিশ ঘাটে আসে না।
তিনি আরো বলেন, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ পদ্মা-মেঘনা নদীর পানির প্রবাহ আগের তুলনায় কমে গেছে। নদীতে চর ও ডুবোচর জেগে ওঠায় ইলিশের চলাচলের পথ সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে চাঁদপুর অঞ্চলে পদ্মা ও মেঘনার বিভিন্ন অংশে চর জেগে ওঠা এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিল্পকারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ নদীতে মিশে পানির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করছে, যা ইলিশের ডিম ছাড়ার জন্য অনুপযোগী হয়ে উঠছে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য ও বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, ইলিশ রক্ষায় সরকার প্রতিবছর মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান, জাটকা নিধন বন্ধ এবং নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞাসহ নানা পদক্ষেপ নেয়। জেলেদের খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হয়। তবে জেলেদের অভিযোগ, প্রকৃত জেলেরা অনেক সময় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে নদীতে এখনো অবাধে কারেন্ট জাল ও অবৈধ জাল ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, ছোট জেলেদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা হলেও প্রভাবশালী অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা সবসময় নেওয়া হয় না।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফ আহমেদ বলেন, কাগজে উৎপাদন বৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ করলেই হবে না, ইলিশ রক্ষায় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। পদ্মা-মেঘনার নাব্য ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং, ডুবোচর অপসারণ, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে ইলিশ আরো সংকটে পড়তে পারে।
এমই