ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর পৌরসভার আলীয়াবাদ গ্রামের ‘আলীয়াবাদ খাল’ তিতাস নদীর সাথে সংযুক্ত বুড়ী নদী থেকে শুরু হয়ে ভাটা নদীর সঙ্গে মিশেছে। গৃহস্থালীর বর্জ্য, ময়লা-আবর্জনা সরাসরি খালে ফেলার কারণে ভরাট হয়ে বিলীন হয়ে গেছে। অপরদিকে অপরিকল্পিতভাবে খালের মুখ বন্ধ করে পৌরসভার রাস্তা নেওয়ার কারণে পানি নিষ্কাশন ও পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়ে চরম পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে।
নিয়মিত পরিষ্কার না করায় বর্জ্য জমে খালের পানি বিষাক্ত হয়ে কালো আকার ধারণ করে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, দেখা দিচ্ছে পানিবাহিত রোগ। ওই পানি কৃষিজমিতে গিয়ে ফসলেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে এবং মশার প্রজননক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে, বর্ষাকালে প্লাবিত হচ্ছে এলাকা, খালের ভরাট অংশে ঘাস, আগাছা ও জলজ উদ্ভিদে পূর্ণ, ফলে আলীয়াবাদ গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। খালটি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার না করায় এই দুরবস্থা হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বর্জ্য পরিষ্কার ও পানি চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় লোকজন আমার দেশকে বলেন, খালটি ২০০৫ সাল পর্যন্ত খরস্রোতা ছিল। বর্ষা মৌসুমে ছোট-বড় অসংখ্য নৌকা চলাচল করত, আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের লোকজন খাল দিয়ে ছোট বড় নৌকা নিয়ে নবীনগর শহরে আসতেন। সব ধরনের দেশি মাছ এই খালে পাওয়া যেত। শুকনো মৌসুমে এই খালের পানি সেচ, কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু আলীয়াবাদ গ্রামের পশ্চিম পাড়া ব্রিজের নিচে মাটি দিয়ে বন্ধ করে পৌরসভার রাস্তা তৈরি করার কারণে পানি চলাচল চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, খালের মধ্যে সরাসরি গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। খালের তলদেশ কৃষিজমির সমতলে এসে দাঁড়িয়েছে। খালের কিছু কিছু জায়গা সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। আবার নিচু অংশের জায়গায় পানি নিষ্কাশন হতে না পারার কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পানি বিষাক্ত হয়ে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, দেখা দিচ্ছে পানিবাহিত রোগ। স্থানীয়রা খালের পাড়ে কৃষিজমিতে চাষাবাদ করছেন, বিচ্ছিন্নভাবে খালের অংশে কিছু ঘরবাড়িও আছে।
আলীয়াবাদ গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি আবদুল হাই মিয়া বলেন, ‘একসময় এই খালের পানি আমরা খাইতাম। অনেক গভীর ছিল খালটি। অনেক চওড়া ছিল। একসময় জোয়ার-ভাটা হইত। এই খালের ওপর দিয়ে রাস্তা হয়েছে। এখানে খালের দুই পাশ দিয়ে যে পাকা রাস্তা হয়েছে, ওইটাও একসময় খালের অংশ ছিল। চোখের ওপরে খালটা মরে গেল।
স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া শিবলী বলেন, বর্জ্যমিশ্রিত পানি ও মশার আবাসস্থল এই খাল। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং নির্বিচারে আবর্জনা ফেলার কারণে ধীরে ধীরে খালটি ভরাট হয়ে গেছে। দু-এক জায়গায় একটু পানির দেখা মিললেও দূষণে তাতে হাত ছোঁয়ানোর অবস্থা নেই। স্থানীয় ব্যক্তিরা মনে করেন, শুধু বড় ধরনের খননকাজ চালিয়ে খালটি বাঁচবে না। খননের পরও ড্রেন থেকে যদি অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি খালে মেশে, তাহলে খালটির পরিণতি এখনকার মতোই রয়ে যাবে।
এলাকার বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ১০-১২ বছর ধরে এই খাল বেশি খারাপ হয়ে গেছে। খালভর্তি ময়লা পানির জন্য খালপাড়ের মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে । কৃষিজমির ওপর দূষিত পানি ঢোকায় কৃষকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
তিনি আরো বলেন, সব ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করে মূল নদীর সঙ্গে খালগুলোর সংযোগ ঘটিয়ে পানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী হেলাল উদ্দিন বলেন, খালটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার মাধ্যমে পানি চলাচল শুরু এবং খালের দুপাশের সৌন্দর্য বাড়ানো হলে, এই খাল নবীনগর পৌরসভার একটি দৃষ্টিনন্দন লেক হিসেবে রূপ নেবে।
এ বিষয়ে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নবীনগর পৌরসভার প্রশাসক মাহমুদুল হাসান আমার দেশকে বলেন, আলীয়াবাদ খালটি রক্ষার জন্য আমরা প্রথম থেকে চেষ্টা করছি। খালটি খনন করার প্রক্রিয়া চলছে। আশা করছি পবিত্র ঈদ উল ফিতরের পরপরই আমরা কাজ শুরু করতে পারব।