চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার জিয়ানগর এলাকায় শহীদ জিয়ার প্রথম সমাধি স্মৃতিসৌধকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘শহীদ জিয়া কমপ্লেক্স’। স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি এতিম ও দুস্থ শিশুদের জন্য বিনামূল্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
কমপ্লেক্সটিতে বিভিন্ন কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল সংকট, দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব এবং পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় এর কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
১৯৮১ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হওয়ার পর বিদ্রোহী সেনারা তার লাশ রাঙ্গুনিয়ার পোমরা ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় গোপনে দাফন করে। প্রায় তিনদিন পর সেই লাশ উদ্ধার করে ঢাকায় নেওয়া হয় এবং সেখানে পুনরায় দাফন সম্পন্ন করা হয়।
জিয়াউর রহমানের প্রথম দাফনের ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে পরবর্তী সময়ে ওই এলাকার নামকরণ করা হয় ‘জিয়ানগর’। প্রথম দাফনস্থল হিসেবে চিহ্নিত স্থানটির পাশে নির্মাণ করা হয় স্মারক কমপ্লেক্স, যা ‘শহীদ জিয়া কমপ্লেক্স’ নামে পরিচিত। ১৯৯৫ সালের ৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কমপ্লেক্সটি উদ্বোধন করেন।
প্রায় চার একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এই কমপ্লেক্সে চারটি দ্বিতল ভবন রয়েছে। এখানে প্রশিক্ষণ হল, ডাইনিং রুম এবং আবাসিক কক্ষ রয়েছে। কমপ্লেক্সটির উত্তরে অবস্থিত পাহাড় ঘেঁষে সমাধি স্মৃতিসৌধ। পশ্চিমপাশে একটি মসজিদ রয়েছে, যার পাশ দিয়েই সমাধি স্মৃতিসৌধে যাওয়ার পথ চলে গেছে।
বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে এখানে এতিম ও দুস্থদের জন্য বিনামূল্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মোট ১০০ জন প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পায়। এর মধ্যে ৫০ জন আবাসিক এবং ৫০ জন অনাবাসিক। আবাসিকদের জন্য সম্পূর্ণ সরকারি খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে অনাবাসিক প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াত ভাতা দেওয়া হয়।
আবাসিক প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য মাসিক জনপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে চার হাজার টাকা খাবার এবং এক হাজার টাকা অন্যান্য খাতে ব্যয় করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক আবাসিককে চার হাজার টাকা বৃত্তি দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পাস এবং বয়স ২০ বছরের নিচে হতে হয়। অনাবাসিক প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াত বাবদ দৈনিক ২৫ টাকা দেওয়া হয়।
এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বছরে দুটি কোর্স পরিচালিত হয়— জানুয়ারি থেকে জুন এবং জুলাই থেকে ডিসেম্বর। প্রতিটি কোর্সের মেয়াদ ছয়মাস। বর্তমানে ইলেকট্রনিক ওয়্যারিং ও মেরামত এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণ চালু রয়েছে।
তবে প্রশিক্ষকের অভাবে সেলাই, মেকানিক্যাল ও ওয়েল্ডিংসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কোর্স দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কোর্স চালু করতে অন্তত আরো তিনজন প্রশিক্ষক প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনায় বর্তমানে মাত্র তিনজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। এদের একজন প্রশিক্ষক, একজন অফিস সহায়ক এবং একজন বাবুর্চি। এছাড়া কমপ্লেক্সসংলগ্ন মসজিদে একজন ইমাম ও একজন মুয়াজ্জিন দায়িত্ব পালন করেন। তাদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য ব্যয়ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বরাদ্দ থেকেই বহন করা হয়। সীমিত জনবল নিয়ে পুরো কমপ্লেক্সের দেখভাল করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা হিমশিম খাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-তত্ত্বাবধায়ক মো. সানাউল্লাহ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কমপ্লেক্সটির তদারকি করছেন। তিনি জানান, জনবল ও বাজেট সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার মতে, কমপ্লেক্সটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আরো ছয় থেকে সাতজন কর্মচারী ও তিনজন প্রশিক্ষক প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, অতীতে জিয়া স্মৃতি মাজারে মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও বর্তমানে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। ফলে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর কমপ্লেক্সটিতে কিছু সংস্কার কাজ করা হয়েছে। এর মধ্যে জিয়া স্মৃতি মাজারে যাওয়ার রাস্তা সংস্কার এবং কবরস্থানের রঙ করার কাজ উল্লেখযোগ্য। তবে স্থানীয়দের মতে, এসব সংস্কার কার্যক্রম সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়।
কমপ্লেক্সের ভবনটির প্রবেশপথে স্থাপিত সাইনবোর্ডে ‘সমাজসেবা অধিদপ্তর এতিম ও দুস্থ শিশুদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ লেখা থাকলেও ‘শহীদ জিয়া কমপ্লেক্স’ নামটি উল্লেখ নেই। পাশে একটি ছোট উদ্বোধনী ফলক থাকলেও সেটি তেমন দৃষ্টিগোচর নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবাহী স্থাপনাটির সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় জনবল ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহনকারী এই কমপ্লেক্সের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।