কোরবানির বাজার
ভারতীয় গরু প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনের সক্রিয় অবস্থানে স্বস্তি ফিরেছে কুমিল্লার খামারিদের মাঝে। তাদের আশা, ঈদ পর্যন্ত এমন নজরদারি বজায় থাকলে এবারের কোরবানির হাটে দেশি পশুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, কুমিল্লার ১৭ উপজেলায় এবার কোরবানির জন্য প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে। এর বিপরীতে জেলার চাহিদা ২ লাখ ৪৭ হাজারের কিছু বেশি। ফলে জেলার চাহিদা মিটিয়েও ১২ হাজারের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা দিয়ে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য জেলার চাহিদা পূরণ করা যাবে।
জানা গেছে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে জেলার ছোট-বড় খামারিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন পশু পরিচর্যায়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করা হচ্ছে গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ। এবার কুমিল্লায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা পশুর মধ্যে রয়েছে—গরু ১ লাখ ৯৯ হাজার, মহিষ পৌনে ২ হাজার, ছাগল প্রায় ৫৫ হাজার, ভেড়া সোয়া ৩ হাজার এবং অন্যান্য পশু প্রায় ২০০।
খামারি ও গৃহস্থরা জানান, চাহিদার তুলনায় বেশি পশু থাকায় জেলার বাইরেও বিক্রির পরিকল্পনা করছেন তারা। এজন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও পশু বিক্রি শুরু হয়েছে।
তবে খামারিদের অভিযোগ, পশুখাদ্যের দাম বেড়ে গেলেও সে অনুপাতে মাংসের দাম বাড়েনি। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চললে অনেকেই খামার ব্যবসা থেকে সরে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
জেলায় প্রায় আড়াই হাজার খামারি এবারের ঈদকে কেন্দ্র করে পশু লালন-পালন করেছেন। পাশাপাশি অসংখ্য গৃহস্থ পরিবারও নিজেদের উদ্যোগে গরু, ছাগলসহ বিভিন্ন পশু মোটাতাজা করেছেন। হাটে দেশি গরুর পাশাপাশি ব্রাহমা, ফ্রিজিয়ান ও শাহিওয়াল জাতের গরুও পাওয়া যাবে।
উপজেলাভিত্তিক তথ্যানুযায়ী, মুরাদনগরে সবচেয়ে বেশি ২১ হাজার ৬৭৬টি পশু রয়েছে। এছাড়া আদর্শ সদরে ২০ হাজার ৯২৩টি, বুড়িচংয়ে ১৮ হাজার ৫৯৪টি, নাঙ্গলকোটে ১৭ হাজার ৩৫৩টি এবং বরুড়ায় ১৭ হাজার ৬৪৭টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। লাকসাম উপজেলায় সবচেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত পশু রয়েছে। সেখানে চাহিদা মিটিয়েও প্রায় আট হাজার পশু অতিরিক্ত থাকবে।
বুড়িচং উপজেলার গাজীপুর এলাকার সাফিন অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক আব্দুল হান্নান জানান, তিনি এবার কোরবানির জন্য ৫০টি গরু প্রস্তুত করেছেন। পাইকারি ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে খামারে আসা শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, ভারতীয় গরু বাজারে না এলে আমরা লাভবান হব। কিন্তু সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকলে খামারিরা পুঁজিও ফেরত পাবেন না।
আদর্শ সদর উপজেলার অরণ্যপুর গ্রামের খামারি আবুল কালাম সরকার টিপু বলেন, আমরা লাভের আশায় গরু পালন করি। কিন্তু চোরাই পথে ভারতীয় গরু এলে প্রতি বছরই ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কোনোভাবেই যেন ভারতীয় গরু দেশে ঢুকতে না পারে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম আমার দেশকে বলেন, এবার কুমিল্লায় কোরবানির চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পশু রয়েছে। ফলে কোরবানির পশু নিয়ে কারো কোনো চিন্তা করতে হবে না। ঢাকা-চট্টগ্রামের মাঝামাঝি অবস্থান হওয়ায় এখানকার পশু সহজেই অন্য জেলায়ও বিক্রি করা যাবে।
তিনি আরো বলেন, কুমিল্লা সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ভারত থেকে অবৈধভাবে কোনো পশু যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য বিজিবি, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। আশা করি আমাদের কঠোর নজরদারির কারণে ভারতের পশু আমাদের দেশে আসতে পারবে না।
কুমিল্লা-১০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গরু চোরাচালান বন্ধে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। কোনো অবস্থায়ই ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবে না ।
তিনি জানান, সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে। সম্ভাব্য প্রবেশপথগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, কোরবানির পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ এবং ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিগগির এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হবে।
জেলা প্রশাসক রেজা হাসান আমার দেশকে বলেন, এবার কুমিল্লায় তিন শতাধিক অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। সীমান্তের ৯৬ কিলোমিটার এলাকায় বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বাজার মনিটরিংয়ে প্রতিদিন দুটি টাস্কফোর্স কাজ করবে। জাল টাকা প্রতিরোধ এবং মহাসড়কে ডাকাতি ঠেকাতে জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশকে সতর্ক রাখা হয়েছে।